বিজ্ঞাপন

৬ষ্ট বর্ষে শিশুকিশোর টুনটুনি! টুনটুনির সকল লেখক, পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা!

'বই আলোচনাঃ 'আলোর ফেরিওয়ালা'


বাংলাদেশের ননএমপিওভুক্ত স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বাস্তব জীবন নিয়ে রচিত
''শিশুকিশোর টুনটুনি''র সন্মানিত উপদেষ্টা, বর্তমান সময়ে দুই বঙের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মুহাম্মদ বরকত আলী স্যারের সামাজিক উপন্যাস
"আলোর ফেরিওয়ালা"। বইটি আগামী মহান একুশে বইমেলা ২০২০ এ পাওয়া যাবে। নিচে বইটির প্রিভিউ দেয়া হলোঃ
প্রিভিউ:
বই: আলোর ফেরিওয়ালা
মুহাম্মদ বরকত আলী
ধরন: উপন্যাস
প্রকাশনা: শব্দভূমি প্রকাশনা
প্রচ্ছদ: হিমেল হক
প্রকাশিতব্য: বইমেলা ২০২০
সংক্ষিপ্ত বিবরণঃ
বাংলাদেশের আনাচে কানাচে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা আছে সেখানে হাজারো শিক্ষক বিনা বেতনে পাঠদান করে আসছেন বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। বেতনের আশায় থেকে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আবার এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, বিনা বেতনে পাঠদান করে অবসরে গেছেন।
এসব স্কুলগুলো কীভাবে প্রতিষ্ঠা হয়, কেন হয়, কীভাবে কারা নিয়ন্ত্রণ করে, এসব কথা নিয়েই এ উপন্যাসের কাহিনি।
কাদের গাজী স্যারের মধ্যেই পাঠক খুঁজে পাবে এসব শিক্ষকের আত্মজীবনী। কাদের গাজী স্যারের করুন বাস্তবতার কাহিনি। গ্রামের মানুষ যাকে বোকা মাস্টার নামে চেনেন। যিনি নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়। অসবর সময় ইট খোলায় কাজ করে জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকেন।
উপন্যাসটি উত্তম পুরুষে লেখা৷ পার্শ্ব চরিত্রে রয়েছে তপু। যে কিনা জেনে বুঝেই একজন শিক্ষকের বিনা বেতনে অবসরের সুবাদে এই মহান পেশায় যোগদান করার সুযোগ হয়েছে।
তপু গল্পের বর্ণনাকারি।
এটা একটা হতভাগ্য বাতিওয়ালার গল্প। আলোর ফেরিওয়ালা। যিনি সারা জীবন অন্যদের মাঝে আলো বিলিয়েছেন। কিন্তু নিজের জীবনেই অন্ধকার নেমে আসে বারবার।

ত্রাণ চোর | কবির কাঞ্চন



মাটির নিচে চাল রেখেছে
খাটের নিচে তেল
নরপিশাচ সেজে ওরা
খেলছে ওদের খেল।
পুকুরতলে চালের হদিস
গুদামে ডাল-তেল
ধরা পড়ে সেই চোরেরা
খাটছে আবার জেল।
ত্রাণের মালে উপঢৌকন
দিচ্ছে আবার কেউ
দলকানাদের পক্ষ নিয়ে
কেউ করে ঘেউঘেউ।
এমন নেতা;নেতা তো নয়
আস্ত একটা চোর!
খুঁজতে হবে নতুন উপায়
আনতে নতুন ভোর। 

অনুগল্পঃ ছিপ ও পুঁটিমাছ | বোরহান উদ্দিন












- মা, মা, কোথায় তুমি?
- এইতো বাবা আমি বাহিরে। কখন এলে তুমি?
- এখন এসেছি। এদিকে আসো।
- আসছি।
বলে মা ছন্টুর কাছে আসছে। আর ছন্টুর এটা প্রতিদিনের অভ্যাস। স্কুল থেকে এসে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে মাকে ডাকতে থাকবে। মনে হয় কতদিন মাকে দেখেনি। মা জানে ছেলের এমন অভ্যাস। কি আর করা। আজ বৃহস্পতিবার। হাফবেলা স্কুল, ছুটি হয়েছে তাড়াতাড়ি। কাঁধের ব্যাগ খুলে বিছানার উপর রেখে দিল। তারপর মা এসে সব গুছিয়ে রাখল। মা বললঃ তুমি মুখহাত ধুয়ে খেতে আসো। এরপর ছন্টু খাবার টেবিলে বসেই খোঁজা-খুঁজি শুরু করলো কিন্তু কথাও পেলো না। মা বুঝতে পেরে বললঃ আজ নেই। আজ বাজারে তোমার বাবা পুটিমাছ পায়নি।
- তাহলে আমি কি খাবো।
- যা আছে তাই দিয়ে খেয়ে উঠো।
কিন্তু ছন্টু খাবার টেবিলে বসেই রইলো। খাবার তার মুখের ভেতর যাচ্ছেই না। পুটিমাছের মচমচে ভাজি ছন্টুর প্রিয়। কিন্তু আজ সেটি নেই। রুই মাছের দোপেয়াজা দিয়ে একটু খেয়ে উঠল। কিন্তু মন খারাপ  করে বসে আছে। হঠাৎই মনে পড়ল পুটিমাছতো আমাদের পুকুরেই আছে। কিন্তু কি করে ছন্টু ধরবে। যেই ভাবা সেই কাজ, মাথায় বুদ্ধি চলে এলো। কিন্তু ছন্টুর তো নেই। ছন্টু তার পাড়ার ছেলে ফন্টুর কাছ থেকে মাছ ধরার ছিপ নিয়ে আসলো। এরপর সামান্য ময়দা দিয়ে মাছ ধরার টোপ বানালো। তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে এসে বসলো পুকুর পাড়ে। তারপর বরশির মাথায় ময়দা লাগিয়ে পানিতে ছুঁড়ে দিল।
পুটিমাছের দল দেখতে পেলো পানির ভেতর ময়দা ঝুলে আছে। ওদের মধ্যে একটা কৈ মাছ ছিল। চালাক কৈ পুটিমাছদের বললঃ তোমরা এখানেই থাকো। এটা আমাদের জন্য ফাঁদ। যা করার আমিই করবো। এইবলে সে টোপের কাছে এসে আস্তে আস্তে ঠুকিয়ে ময়দা গুলো খেয়ে ফেলল। পানির উপর বরশির ফাঁতা নড়েচড়ে উঠল। ছন্টু বরশী তুলে দেখে টোপ নেই। টোপ লাগিয়ে আবার পানিতে ছুঁড়ে মারে। এভাবেই বেশ কিছু সময় চলে যায়। কিন্তু ছন্টু একটি মাছ ও পায়না। এরপর ছন্টু বুদ্ধি করে বরশীর মাথায় সামান্য তুলা পেচিয়ে তার উপর ময়লা লাগিয়ে পানিতে ছুঁড়ে দিল। এবার কৈ মাছ এসে টোপের ময়দা খেতে লাগলো। একটু পরে তুলা বেরিয়ে পড়লো। কৈ ওটাকে ময়দা ভেবে ঠোকাতে শুরু করল। এক সময় কৈ আটকা পড়ে গেল। এরপর নিজেকে ছাড়াতে যখনি বরশি টেনে নিচ্ছিল। তখনি ছন্টু ছিপ টেনে উপরে উঠালো। ছন্টু দেখলো একি এতো পুটিমাছ নয়, এটা কৈ মাছ।
কিন্তু ছন্টু তো পুটিমাছ ধরতে এসেছে। এরপর ছন্টু আবার বরশি ফেলে। এবার পুটিমাছ ধরা পড়ে। এভাবেই পরপর বরশি ছুঁড়ে অনেকগুলে পুটিমাছ ধরে ফেললো।
পাত্রে করে কিছু আনতে দেখে মা বললঃ ছন্টু, ওগুলো কি বাবা।
- মা, এগুলো আমাদের পুকুরের মাছ। বরশি ফেলে ধরেছি।
মা আপ্লূত হয়ে বললঃ খুব ভালো করেছ বাবা। তুমি তো নিজে চেষ্টা করতে শিখেছ। মা আদর করতে থাকে ছন্টুকে। এরপর ছন্টু মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে থাকে।

ছড়াঃ টোকাইর ভাবনা | শাহ আলম বাদশা











আমার কথা কেউ ভাবে না
কেউ ডাকে না আমারে
কোথায় থাকি কেউ বলে না
নোংরা কেন জামা রে?
ফুটপাতে রই শুয়ে-বসে
নাম হয়েছে টোকাই যে!
আমারও তো বাপ-মা ছিল
ছিলাম বাবু-খোকাই যে!
কাগজ-কুড়াই বেচি মালা
যায় না তবু খিদের জ্বালা
কুকুর আমার সঙ্গীও;
ইস্কুলে যাও তোমরা সুখে
বুকটা আমার ভাঙে দুখে
কতবাধাই লঙ্ঘিও।
তোমার আছে বাড়ি-গাড়ি
আমরা শুধু খাই তো ঝাড়ি
কেউ শোনে না কান্না তো!
না পেলে তাই উপোস থাকি
কেউ শোনে না যতই ডাকি
হয় না কভু রান্না তো?
এমনি করে যাই মরে যাই
জগত থেকে যাই সরে যাই
তোমরা যাবেই যেখানে;
এই ব্যবধান থাকবে কি রে
সবাই সমান গোপন-নীড়ে
পার পাবে না সেখানে!

কোথায় সে দিনগুলো | শংকর দেবনাথ















কিশোর রোদের কল্পবোধে তপ্ত করে মনন,
প্রাণের খোঁজে নিত্য গো যে অতীত করি খনন।
ডুব-সাঁতারের খুব মজারু পদ্মদীঘি-দুপুর,
বুকের ভেতর সুখের সুরে শোনায় ঝাপুরঝুপুর।
দলবেঁধে ঝলমল আনন্দে স্কুলে যাওয়া আসার,
স্মৃতির পথে কুড়াই নিতি গন্ধ ভালবাসার।
খেলাধুলোর বিকেলগুলোর গল্প মনের কোণায়,
বেড়ায় খুঁজে দু'চোখ বুজে হারিয়ে ফেলা সোনা-ই।
বন্ধুরা কোন দূর অজানায় হারিয়ে গেল সবাই?
আনচানানো কান পেতে রই শুনব বলে রব-'আয়'।
কিশোরবেলার স্বপ্নখেলার সে দিনগুলো কোথায়?
খুঁজছি তাকে স্মৃতির বাঁকে  কষ্টনদীর সোঁতায়।

কবিতাঃপাখিদের কলতান | মৌসুমী বিশ্বাস
















গাছে বসে দুটি পাখি 

 করছে ভীষণ ঝগড়া ।

চড়ুই এসে বলল হেসে,

থামবে এবার তোমরা !

মাছরাঙা বলল শেষে,

  মাছ খাবে তোমরা ?

চুনো পুঁটি ধরেছি আমি 

  আর একটা দামড়া।

বাবুই পাখি বানায় বাসা
 
 উল্টো কুঁজো যেন !

থাকতে পারো তোমরা দুজন 

       প্রশ্ন করো কেন?

জমিদারের কাজ করে যে

   ঝাড়ুদার পাখি,

বলতে পারো নাম টা তার ?

    কান মোলব নাকি ?



 লেখকঃ 
 মৌসুমী বিশ্বাস, 
Mobile-6296427360
Address  -----
 Purono Hut . Main Road .
Post ---- Burnpur  .  Dist --- paschim Bardhaman. 
Pin ---- 713325 
West Bengal 

ছড়াঃ রংধনু | ফেরদৌসী খানম রীনা



নীল আকাশে সাতটি রঙে
রংধনুর ঐ খেলা,
দেখে দেখে চলে গেল
সোনালী বিকেল বেলা।

রংধনুর সাতটি রঙ
দেখতে লাগে বেশ,
মুগ্ধ হয়ে পুলকিত মনে
শেষ হয় না তার রেশ।

লাল, নীল, সাদা, কালো
হলুদ আর বেগুনী,
সব রঙই লাগে ভালো
গোলাপিও সুন্দর জানি।

এত রঙের ভিড়ে,
মন হয়ে যায় উদাসি,
চোখের পলক পড়ে না তাই
দেখতে ভালোবাসি।

রংধনুর সাতটি রঙে
আকাশ করে ঝিলমিল,
মনের  সাথে রয়েছে তার
অনেক অনেক মিল।

মন আকাশে রংধনুর
পড়লো বুঝি ছায়া,
সাতটি রঙের মাঝে মিল
খুঁজে যায় না পাওয়া।

নীল - নীলিমার ছোঁয়া পেয়ে
সাজলো আজ আকাশ,
মৃদু সমীরণে বইছে তাই
স্নিগ্ধ কোমল বাতাস।   

ছড়াঃ বদমাশ বাঘ | সবিতা বিশ্বাস












বাঘ তুই বদমাশ
খালি হাঁক ডাক
মেরে দেবো ঠাস ঠাস
চুপ করে থাক

বাদাবন ছেড়ে কেন
এলি লোকালয়ে?
গোঁফ দেখে কচিকাঁচা
কেঁপে মরে ভয়ে

ওই শোন হইচই
তোকে বাগে পেলে
ফুটবল খেলবেই
মারাদোনা পেলে

চুপিসারে ফিরে যারে
রেখে পায়ে ছাপ
এবারের মতো তোকে
করে দেবো মাফ।
        
লেখকঃ 
সবিতা বিশ্বাস
প্রযত্নে-- লঙ্কেশ্বর বিশ্বাস
গ্রাম ও পোস্ট -- মাজদিয়া ( বিশ্বাস পাড়া)
জেলা-- নদীয়া। পিন-- ৭৪১৫০৭
ফোন-- ৮৯০০৭৩৯৭৮৮
ভারত

গল্পঃ কালো বিড়াল | মোহন মিত্র


                                
রনৌলি থেকে বনকুলে যাওয়ার পথটা বড় নির্জন। রনৌলি বাস স্ট্যান্ড থেকে যে রাস্তাটা পশ্চিম দিকে গেছে সেদিকে একটা হাটখোলা আছে। সপ্তাহে দুদিন হাট বসে। সোমবার আর শক্রবার। তারপরে আট দশটা বাড়ি নিয়ে একটা পাড়া। পাড়াটার নাম পশলা। পশলা থেকে বেরিয়েই অনেকটা ফাঁকা রাস্তা। দুই ধারে ধূধূ মাঠ। কিছুদুর এগিয়ে গেলে আসে একটা ছোট নদী। শীতকালে হাঁটুজল থাকে। লোকে শর্টকাট খুঁজতে হাটুজল পেরিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু বর্ষাকালে দুকুল ছাপিয়ে যায়। তখন নদী পারাপারের জন্য গ্রামের লোকেরা বাঁশের পুল বানায়। জলের স্রোতে পুল কাঁপতে থাকে। হাতল হিসাবে ধরার জন্য থাকে দুধারে বাঁশের রেলিং। তার নীচ দিয়ে পা ফসকে পড়লে আর রক্ষে নেই। সেই পুল পেরিয়ে এলে পরে একটা গ্রাম, গোশালা। মাঝি, মাল্লা, ঢাকি, জেলে, এবং জন মজুর খেটে খাওয়া মানুষদের বাস। ছোট ছোট ঘর। কোথাও একচালা কোথাও দোচালা। গোশালা গ্রামের ভেতর দিয়ে রাস্তা। অবৈধ দখলে রাস্তাটা সরু এবং অত্যন্ত নোংরা। চারিদিকে নর্দমা, গোবর এবং আবর্জনায় থিকথিক করে। বিশ্রী গন্ধ। হেঁটে পার হতে দম বন্ধ হয়ে আসে। গোশালার পরে শুরু হয় ঘন আম বাগান, বাঁশ বাগান। একদেড় ফুট উঁচু মাটির রাস্তা। লোকে বলে সড়ক। দুধারে বড় বড় আম গাছ। কোথাও কোথাও বাঁশ ঝাড়। আম গাছের আসেপাশে নানা রকম ছোট ছোট জংলি গাছের ঘন ঝোপঝাড়। সন্ধ্যের পর সে রাস্তা দিয়ে যেতে হলে গা ছমছম করে। বাঁশের ঝাড়ে একটু হাওয়া লাগলেই নানা রকম আওয়াজ হয়। ঝির ঝির, শির শির, ক্যাঁচ ক্যাঁচ। জোনাকিরা এত ভিড় করে মনে হয় আকাশের তারারা মাটিতে নেমে এসেছে। আম বাগানের মধ্য দিয়ে একটু এগিয়ে এলে রাস্তার এক্কেবারে ধারে দেখা যায় একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছ। হাওয়া না থাকলেও তার পাতা নড়তে থাকে, অদ্ভুত আওয়াজ বের হয় সেখান থেকে। এখনও আছে সে গাছ। সেই গাছের দক্ষিনে একশ গজ দূরে মুসলমানদের কবরস্থান। সেই কবরস্থান এবং অশ্বত্থ গাছ নিয়ে বহু কাহিনী বংশপরম্পরায় প্রচলিত আছে। সেগুলি আমরা অনেক শুনেছি। ছোটবেলায় সেখান দিয়ে যাবার সময় বড়রা রামনাম জপতে জপতে যেত আর আমরা ছোটরা তাদের জরিয়ে ধরে, প্রায় চোখ বন্ধ করে পার হতাম।

আসলে ওখানে এলেই মনে পড়ত, কে কবে কাকে হঠাৎ গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতে দেখেছিল। কেউ আবার কাউকে গাছের উপরে বসে কাঁদতে দেখেছে। কখনও আবার কেউ কাউকে এগিয়ে দিয়ে গেল। কেউ আবার ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। সব চেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হোল সেই দেখতে পাওয়া লোকগুলো সবাই মৃত। তারাই নাকি কবরস্থান থেকে উঠে এসে এই সব করে। তার মানে এই সব ঘটনা ভূতের। সত্য বা মিথ্যা জানিনা। কিন্তু, আজও যখন গ্রামে যাই, সে স্থান এলে আমরা নিজের অজান্তে হঠাৎ যেন চুপ করে যাই, গা শিউড়ে ওঠে। উঠতি বয়সে যখন ভয়কে জয় করার উদ্দাম সাহস দেখানোর চেষ্টা করি, নিজেকে বড় প্রমান করার চেষ্টা করি, সে সময় আমরা একাই যাতায়াত করতে শুরু করি।

সাধারন ভাবে লোকেরা রনৌলি থেকে সন্ধ্যের পর বনকুলে ফিরলে একজন অন্তত সাথী খুঁজেই পথ চলতে শুরু করত। কিন্তু আমরা তখন গ্রামের উঠতি হিরো। তখন আমরা হাতের কনুই বাঁকিয়ে, কব্জিটা একটু ট্যারা করে বুক ফুলিয়ে হাঁটি। যেমন মস্তানেরা হাঁটে আর কি! সে বয়সে আমাদের সাথী খোঁজার অর্থ হোল আমরা এই ভৌতিক কান্ডকারখানায় বিশ্বাস করি এবং প্রশ্রয় দিই। সেটা কিছুতেই বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে মানতে পারিনা। তাই সাহস দেখাতে অনেক সময় এক্সট্রা কভার ড্রাইভ মেরে বসি। সেই রকম একটা ঘটনার কথা বলি।

সরস্বতী পুজোর রাত। আমি তখন নবম শ্রেনীর ছাত্র। গ্রাম থেকে এক মাইল দূরে  রনৌলিতে আমাদের কো-এডুকেশন স্কুল। বাড়িতে সরস্বতী পুজো হলেও স্কুলের পুজোয় ছাত্রদের থাকতে হত। তাছাড়া নিয়ম অনুযায়ী নবম শ্রেনীর ছাত্ররা পুজোর সম্পূর্ণ দায়ীত্বে থাকে। সেদিন আবার সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমাদের নাটক ছিল। আমাদের সংস্কৃত পন্ডিতমশাইয়ের লেখা নাটক ভারতমাতা। আমি কনিষ্কর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। আমাদের গ্রামের একটা মেয়ে বুলু হয়েছিল ভারতমাতা। যেমনটা হয়, নাটক শুরু হয় সবার শেষে। শেষ হতে রাত প্রায় দশটা। ড্রেস চেঞ্জ করে যখন বাইরে এলাম আমাদের গ্রামের ছেলেরা এবং দর্শকদের প্রায় সবাই চলে গেছে। অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রী ভারতমাতা মুখের রঙ উঠিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে তখন আমার সাথে। আমরা দুজনে যাব বলে স্কুল থেকে বেরিয়েছি। দুজন আছি তাই ভয়ের কিছু নেই। এমন সময় ধীরেনকাকা মানে বুলুর বাবা সাইকেল নিয়ে হাজির হলেন বুলুকে বাড়ি নিয়ে যেতে।
ধীরেন কাকা, আর সবাই কোথায়? বুলু চলে আয় আমার সাইকেলে
বুলু আমার দিকে একটু করুণ চোখে তাকাল। কী ভেবে জানি না।
আমি বললাম, তুই চলে যা সাইকেলে তোর বাবার সাথে। আমি হেঁটে আসছি
ধীরেন কাকা বুঝলেন আমি একা আছি। তাই তিনি অবশ্য আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুই একলা আসতে পারবি তো, অমল? নাকি সবাই মিলে হেঁটে যাব?
আমি স্টাইল মেরে বলেছিলাম, না কাকা, তোমরা চলে যাও। আমি চলে যাব

বুলু চলে গেল ওর বাবার সাথে। আমি একা হন হন করে হাঁটতে লাগলাম। আমাদের স্কুলটা ছিল বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি। হাঁটখোলা থেকে বেরিয়ে বাঁ হাতে রাস্তার ধারে আছে একটা কালীবাড়ি। সবাই বলে খুব জাগ্রত মা কালী। ঐ অঞ্চলে সবার  শুভ কাজ শুরু হয় সেখানে পূজো দিয়ে। কেউ কোন সমস্যায় পড়লে তাঁকেই আগে স্মরণ করে। আমরাও ছোটবেলা থেকে তাই করে আসছি। কালীমাতার আদেশে কোন মন্দির তৈরী হয়নি। ঘন জঙ্গলে ঘেরা সুন্দর এক পবিত্র স্থান। সেখানে প্রস্তরখন্ড রূপে মা বেদীতে আধিষ্ঠিতা। হয়ত কোন এক সময়ে পাথরের পূর্ণ মূর্তি ছিল, কালে ক্রমে সেটা ভেঙে ঐ রূপ পেয়েছে। তাতে মানুষের মনে ভক্তির কোন খামতি হয়নি। যাওয়া আসার পথে মানুষ ভক্তিভরে একবার মা কালীকে স্মরণ করে। আমিও মনে মনে একবার মাকে স্মরণ করে হাঁটতে লাগলাম। গ্রামের রাত দশটা মানে নিশুতি রাত। ভয় তো লাগেই। কাউকে বুঝতে না দেবার চেষ্টা করি। সামনে দূরে গোশালা গ্রামের একআধটা বাড়ি থেকে একটু আলো দেখা যাচ্ছে। দূরের গ্রামে কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। দুএকটা ছোট বাচ্চা কাঁদছে তার ক্ষীণ আওয়াজ আসছে। দ্বিতীয় প্রহরের শেয়ালের হুক্কাহুয়া শেষ হয়ে গেল। আমি এক মনে মনে হেঁটে চলেছি।

পেছনে একটা সাইকেলের ঘন্টা বাজলো। আমি পাশে দাঁড়ালাম রাস্তা ছেড়ে। না হলে হয়ত অন্ধকারে আমার ঘাড়েই উঠে পড়বে। আমার এক্কেবারে পাশে এসে সাইকেল আরোহী জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলো, কে অমল? তুই এত রাতে একা কোথা থেকে? তাঁকে চিনলাম। আমাদের গ্রামের রঘুদা। রনৌলিতে বুলুর বাবা ধীরেন কাকার বিদেশী মদের দোকানে কাজ করে। ধীরেনকাকা আগে বেরিয়ে এসেছেন। তাই সে দোকান বন্ধ করে একা ফিরছে। তার মুখ থেকে একটু হুইস্কির গন্ধও পেলাম। মালিক নেই দেখে নিশ্চয় মেরে দিয়েছে একদু পেগ। রাতে তার ঘুমটা ভালোই হবে।

আমি বললাম, স্কুলে সরস্বতী পুজোর জন্য দেরী হয়ে গেল, রঘুদা
রঘুদা জড়িয়ে আসা গলায় শুধাল, তুই একা আসতে পারবি তো? নাকি আমিও হাঁটব তোর সাথে?
গ্রামের লোকেদের এই আপন বোধটাই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মত। আজও মনে পড়ে সে সব কথা। শহরের যান্ত্রিকতায় লোক হ্যালো বলতেই সময় পায়না।
বললাম, না, না, রঘুদা, তুমি চলে যাও। এই তো অর্ধেক পথ চলে এসেছি। বাকিটা চলে যাব

রঘুদাও টিং টিং ঘন্টি বাজাতে বাজাতে চলে গেল। সম্ভবত সেই ছিল শেষ যাত্রী আমাদের গ্রামে যাওয়ার। আমি সেই বিখ্যাত গোশালা গ্রামে ঢুকলাম। নোংরা আবর্জনা জর্জরিত পথটা তাড়াতাড়ি পার হতে হবে। সেখানেও এক দুজন জিজ্ঞেস করল, অমল বাবু, নাকি? যেতে পারবেন একা? বলেন তো এগিয়ে দিয়ে আসব। ওরা সবাই আমার বাবার অনুগত। আমাদের আপনজন। আমি বললাম, না গো, এইতো বাড়ি এসে গেছি প্রায়

ওদের গ্রামটা পেরিয়েই আম বাগান, বাঁশ বাগান শুরু হয়ে গেল। চলবে আমাদের বাড়িতে ঢোকার ঠিক আগে পর্যন্ত। একটু এগোতেই এসে গেল সেই অশ্বত্থ গাছ। যদিও মনের কোণে আগেই এসেছিল তার অস্তিত্ব। দূর থেকে তার পাতার শিরশির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তাকিয়ে দেখলাম আকাশ ভর্তি অসংখ্য তারা। সবুজ পাতা কালো কালো দেখাচ্ছে। আমার মনের মধ্যে অনেক বার শোনা গল্পগুলি ভির করতে লাগলো। জোর করে মনকে শক্ত করছি। গুণ গুণ করে গান গেয়ে ভয়কে জয় করার অহেতুক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম যেতে তো হবেই। যা হয় হোক।

গাছের তলায় আসতেই যেন মনে হোল গাছটার পাতাগুলো বেশী জোরে নড়ছে। কিন্তু তেমন জোরে তো হাওয়া বইছিল না। সারা গায়ে একটা ভয় মিশ্রিত শিহরণ অনুভব করলাম। গাঁয়ের রোম খাড়া হয়ে উঠল। কোনদিকে না তাকিয়ে রাস্তা দিয়ে চলতে লাগলাম। মা বলতেন, কখনও ভয় পেলে রাম রাম বলবি। সব ভয় কেটে যাবে। আমিও মনে মনে রাম, রাম বলতে বলতে হাঁটছিলাম। কোথাও কোন লোকের সারা নেই। কোথাও কোন শব্দ নেই। শুধু আমার পায়ের জুতোর দুপদাপ আর রেয়নের প্যান্টের খসখস শব্দ শুনছি। আমি একা সেই অন্ধকার রাতে বিশাল আমবাগানের রাস্তায় একঝাঁক জোনাকির মাঝে হেঁটে চলেছি। মনে দারুন অজানা সংশয়। ঐ নিস্তব্দতার মধ্যে একবার মনে হল কেউ যেন আমার পেছনে আসছে। কিন্তু কোন কারণেই পেছনে তাকানো যাবেনা, বড়রা বলে দিয়েছেন। পেছনে তাকালেই সে ঘাড় মটকে দেবে। গায়ের রোম আগেই খাড়া হয়ে ছিল, মনে হল কেউ যেন ফিসফিস করে কানের কাছেই কিছু বলাবলি করছে। আমি আমার হাঁটার স্পিড বাড়ালাম। হৃদপিন্ডের স্পীড তো আগেই বেড়ে গেছে। যতটা সম্ভব দৃষ্টি রাস্তাতেই নিবদ্ধ রেখে চলছিলাম। এ পাশ ও পাশ দেখাও বিপজ্জনক বলেই শুনেছি। এখনও আটদশ মিনিটের পথ বাকী। হঠা চোখের কোন দিয়ে দেখলাম ঠিক আমার ডানদিকে রাস্তার নীচে একটা কালো বিড়াল আমার সমান্তরালে হাঁটছে। ওটার গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। আমার দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে হাঁটছে। ওর চোখদুটো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছিল। ভয়ে আমার গা  দিয়ে ঘাম ছুটছিল ওই শীতকালেও। আমি সোজা হাঁটছিলাম এইভেবে যে ওটা হয়তো অন্যদিকে চলে যাবে। কিন্তু না, ওটা ঐ ভাবেই চলছিল। মুহূর্তের মধ্যে কালো বিড়ালের ভুতুরে গল্পগুলো, যা শুনেছিলাম আগে, মনে এলো। আমার সব সাহস মুহূর্তের জন্য উবে গেল

কী যে হল আমার মনে নেই। আমার ভেতর থেকে একটা প্রচন্ড জোরে চিৎকার বেরিয়ে এলো বিড়ালের দিকে চোখ রেখে। সেই চিৎকার আমি আর কোনদিন বের করতে পারিনি। আমি দেখলাম আমার ঐ গলা ফাটানো চিৎকারে বিড়াল কোথায় উধাও হয়ে গেছে। আমার ভয় কিন্তু ছিলই যদি আবার ফিরে আসে। যতটা সম্ভব জোর কদমে হাঁটতে লাগলাম। দৌড়ানো যাবেনা। দৌড়ালে নাকি ওরা আরও পেয়ে বসে। ততক্ষনে বাড়ির আলো দেখতে পেয়ে গেছি। বেড়ে যাওয়া হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হতে লাগলো। বাড়িতে পৌঁছে অনেকক্ষন চুপ করে বসেছিলাম। মা বুঝতে পেরেছিলেন আমি ভয় পেয়েছি। আমার মাথায় ঠাকুরের পুষ্প ঠেকিয়ে বলেছিলেন, রাত বিরেতে এখানে সেখানে একা একা যেতে হয় না। কতকিছু অতৃপ্ত ঘুরে বেড়ায়

পরে অনেকবার  রাস্তায় একা একা অনেক রাতে এসেছি। আর কখনও সেরকম কোন পরিস্থিতির মধ্যে পড়িনি। সেই কালো বিড়ালের রহস্য আমি আজও বুঝতে পারিনি – বিশেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে একটা দূরত্ব রেখে বিড়ালের চলাটা কখনই স্বাভাবিক ছিলনা।
লেখকঃ
মোহন মিত্র, 
১৩সি/১৩, অনুপমা হাওজিং কমপ্লেক্স,
ভি আই পি রোড, কোলকাতা  ৭০০০৫২
মুঠোফোন - ৯১৬৩৭৮০৭৫১
                                           

ছড়াঃনাচানাচি | আসাদ বিন হাফিজ



শিয়াল নাচে পিয়াল বনে
হাতি বাঘের সনে
নাচ জুড়েছে খাটের ওপর
ছোট্ট আমার কনে।

বৃক্ষ নাচে বাতাস পেলে
নাচে নদীর ঢেউ
এ দুনিয়ায় সবাই নাচে
বাদ থাকে না কেউ।
যার যার মত মানুষ নাচে
সবাই জনে জনে।

বক্তৃতাতে কেউবা নাচে 
কেউবা নাচে রনে
কেউবা নাচে শুয়ে শুয়ে
একা মনে মনে।

ভৌতিক গল্পঃ অভিশপ্ত নদী | সেবিন মিয়া

    

কূপতলা শহর থেকে প্রায় বাইশ কি.মি. দূরে ছোট্ট একটি পাড়া গাঁ। খুব অল্পসংখ্যক লোক নিয়ে গ্রামটির পথচলা। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিস্তীর্ণ মাঠ, মাঝখানে কয়েকটি ছোট ছোট ঘর আর সুউচ্চ গাছপালা নিয়ে প্রকৃতির বুকে স্বগর্বে দাড়িয়ে আছে গ্রামটি।গ্রাম ভেদ করে এঁকেবেকে চলেছে কাঁচা রাস্তাটি। গারোয়ালের ভাটিয়ালি গান আর কৃষকের হালের ফলা যেন গ্রামটিকে সর্বদা নতুন রুপ দিয়ে চলেছে। গ্রামের পাশ কেটে চলে গেছে বাঙ্গালী নদী।এ যেন প্রকৃতির এক অপরুপ সৃষ্টি।

অপরুপ এই গ্রামটির নামকরণ নিয়েও অনেক গল্প শোনা যায়। 
শত শত বছর কয়েকটি বড় কূপ নিয়ে পড়ে ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এই জায়গাটি।
যমুনা নদীর তীরবর্তী কিছু ঘর প্রবল বন্যা এবং ভূমিধ্বসে অতল গভীরে নিপতিত হলে ভিটেহারা অসহায় মানুষগুলো পতিত জমি ভরাট করে বসতি গড়ে তুলে।

এছাড়া আরও একটি ঘটনা বিদ্যমান। এককালে কোন এক গ্রামের বড় সাব সেখানে গোসল করতে এলে এক অশরীরী আত্মার প্রভাবে তার একটি পা বিকলঙ্গ হয়ে যায়। সেই হতে এই গ্রামের নাম কূপতলা।

হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়ে গ্রামটি গড়ে ওঠেছে।
সমরেশ ও জহির এগাঁয়েরই বাসিন্দা। ধর্ম ভিন্ন হলেও তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে নিবিড় সম্পর্ক। একে অন্যের খুব কাছের মানুষ।
জহির খেটে খাওয়া কৃষক।
সমরেশ পেশায় জেলে। নদী তার আশ্রয়কেন্দ্র। অন্ধকার রাত তার অতি আপন।খরো রোদ্দুরে সারাদিন নদীর পানি উত্তপ্ত থাকে ফলে মাছ তেমন দৃষ্টিগোচর হয় না।তাই রাতের আধারে ছুটতে হয় সমরেশকে।যদিও এ নদীর ভয়ঙ্কর রুপের কথা সবারই জানা ।
রাতের আধারে নদীতে যাওয়া জহিরের কাছে পছন্দীয় নয়। কার না জীবনের মায়া আছে!! সমরেশ যে বড্ড নিরুপায়। পরিবারের মুখে দু-চারটে ভাত তুলে দিতে শত বাধা-বিপত্তিকে তাচ্ছিল্য করে ছুটতে হয় ভয়াল ঔ নদীর পানে। 

নদীটা খুব চওড়া নয়। চৈত্র মাসে এর অনেকাংশ শুকিয়ে যায়।তখন সমরেশকে একধাপ ফোর গুনতে হয়। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে নদী তার ভরা যৌবন ফিরে পায়। সেই সাথে সমরেশেরও মন ভরে উঠে। সমরেশের মনের অভিপ্রায়, "যদি সারাজীবন নদীটা ভরা যৌবনা থাকতো তাহলে হয়তো তাকে খুব একটা টানাপোড়ন সইতে হতো না।
শমরেশ রাতে আর জহির দিনে কাজ করে তাই তাদের খুব একটা গল্প করার ফুসরত হয় না। তাই জন্য জহির মাঝে মাঝে আড্ডা দিতে অন্ধকারে বন্ধুর সাথে সঙ্গ দিয়ে মনটাকে চাঙ্গা করে।
পাড়ার বুড়োদের কাছে এ নদীর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানা যায়। 
অনেকদিন আগের কথা, এগ্রামে মাজেদ নামে এক জেলে ছিল। সমরেশের মতোই নাকি তার মাছের নেশা ছিল। একরাতে মাছ ধরতে গেলে তিনি এক ছদ্মবেশী পেত্নীর খপ্পড়ে পড়ে। অবশেষে ভোরে গ্রামের অদূরে হিজলা গাছের কাছে তার ছেঁড়া রক্তাক্ত শরীর উদ্ধার করে গ্রামবাসী। অনেক দিন এর প্রকপটতা থাকলেও এখন আর সে কথাগুলো কেউ কানে তুলে না।

আজকাল জহিরের কাজ-কর্ম কমে গেছে। প্রায়ই তাকে ঘরে থাকতে হয়। তাই চিন্তা করল সমরেশের সাথে ঘুরে আসা যাক নদী থেকে।তৎক্ষণাতই ছুটে গেল শমরেশের বাড়ি। দুই মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে সমরেশের সংসার। সারাবছর অভাব লেগেই থাকে সংসারে। নিত্যা দিন কার মতো পান্তা ভাতে মরিচ নিয়ে মধ্যাণ্য ভোজনে বসেছে সমরেশ।তড়িঘড়ি করে চৌকি এগিয়ে দিল মধুরানী।জহির মিয়া একখানা পানের আবদার করে চৌকিতে ঠেস দিয়ে বসে সমরেশের সাথে আলাপে উদ্যত হলো।“ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে, কাজ কর্মে বেশ মন্দাভাব চলছে। তাই চিন্তা করলাম আজ নদীতে যাবো তোমার সাথে" বলল জহির।
"আরে সে তো বেশ ভালো কথা। তোমার সাথে অনেকদিন যাবত বেশ ভালো করে গল্প জমে উঠে নি। আজ একটা ভালো সুযোগ হবে।"উত্তর করল সমরেশ।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে জহির বলল তাহলে এখন উঠি। "তুমি আগেই যেইও। আমার বাড়িতে একটু কাজ আছে, হাক ছেড়ে তোমাকে খুঁজে নেবো,সজাগ থেকো।" বলে চলে গেলো জহির।

এশার আজান হয়ে গেছে। সমরেশ তার জালগুলো গুছিয়ে নিল। মধুরানী একটা পুটলিতে খাবার বেঁধে আনলো। জহির যাবে নদীতে তাই পুটলিটা বেশ বড় হয়েছে আজ। সমরেশের বিড়িহীন এক মূহূর্ত চলে না। ছোট মেয়ে এক প্যাক বিড়ি আর দিয়েশলাই দিয়ে গেল। মেয়েটির গালে চুমু দিয়ে তা কোমরে গুজে নিল সমরেশ।

ঘর থেকে বের হতেই মধুরানী সিল নিয়ে প্রস্তুত। প্রাচীনরীতি, মাছ ধরতে যাওয়ার পথে ঢিল ছুড়লে নাকি অনেক মাছ পাওয়া যায়।সকল কার্য শেষে বিদায় নিয়ে শমরেশ হাঁটতে শুরু করলো। 

একক্রোশ পথ।সমরেশ হাঁটতে লাগলো আনমনে।বাঁশঝারের পাশ কেটে নদীপথ। হঠাৎ একটি কালো বিড়াল দৌড়ে এসে তার পায়ে বেড়ি কাটতে লাগলো।কালো বিড়াল শুভ নয়। পথে বাঁধা-বিপত্তির সম্ভাবনা থাকে। বাম পায়ে লাথি দিয়ে তাড়ালো বিড়ালটাকে।অবশেষে পৌছিল নদীর তীরে।
আজ কেমন জানি নদীটা শান্ত। কোথাও কোনো নৌকার দেখা নেই জনমানবের আনাগোনা নেই। মাঝে মাঝে শুধু নদীর গতিবেগের ছল ছল ধ্বনি কর্ণগোচর হলো। একরাশ ভীতি তার গা ছাপিয়ে চলে গেল!! ফিরে যাবার মত করল।  জহির আসার অভিপ্রায়ে আবার থেমে গেল সমরেশ। 
ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আস্তে আস্তে নৌকার গলুইয়ের উপর বসে পড়লো সমরেশ;নদীটাও যেন আজ তার সাথে বৈপরীত্য করে চলছে।
ঠান্ডায় হিম হয়ে গেছে তার শরীর।নদীর মাঝ বরাবর জালটা ফেলে গোছ থেকে বিড়ি বের করলো।ছইয়ের নিচে টিপ টিপ করে জ্বলছে লন্ঠন।বিড়ি ধরিয়ে লন্ঠনের আগুনে ঠান্ডা হাত গরম করার বৃথা চেষ্টা করতে লাগলো সমরেশ। আনমনে আজ যেন কত কি-ই না ভাবছে সমরেশ।স্বপ্নের মায়াজালে বাঁধা এই দেহখানা কতটি বছর পারি দিল। না জানি আরও কত স্বপ্ন ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে পার হবে, সে এক বিশাল অধ্যায়। টিপ টিপ করে জ্বলা লন্ঠনের মতোই যেন তার আশাগুলো জ্বলছে তার মনের কোণে। কবে যে প্রজ্বলিত হবে তার কোন হদিস মিলে না।ভাবতে ভাবতে দেহ নিথর হয়ে এলো।পৃথিবীর সমস্ত ঘুম যেন আজ তার চোখে।চোখের পাতা টেনে তোলার জো নেই।অক্লান্ত মন আজ ক্লান্ত হয়ে বিশ্রামের জন্য নেতিয়ে পড়লো নৌকার উপর। 

রাত প্রায় বারোটা। নদীর তীর হতে একটা চেনা গলা ভেসে এলো। কর্ণগোচর হতেই ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলো সমরেশ।  
তীর হতে জহির হাঁকছে, "সমরেশ দাদা ও সমরেশ দাদা, আমি জহির, আমারে নিয়ে যাও।"
সমরেশের ভীতি যেন অনেকাংশেই কেটে গেল।
প্রত্যুত্তরে বলল, "দাঁড়াও জহির ভাই আমি আইতাছি" 
জলদি বৈঠা চালিয়ে পৌছিল নদীর তীরে। আমিতো ভাবলাম তুমি আর আসবে না! তাই শুয়ে শুয়ে নানান কথার হালনাগাদ করছিলাম,যাক ভালোই হলো তুমি এসে!তা   তোমার হাতে কি ওগুলো??
"আর বলো না দাদা তোমার বৌদি পিঠা তৈরি করছিল।শুকনা জিনিস, আনতে নিষেধ করলো! যেখানে তুমি আছো সেখানে কি আর ডর আছে?" বলতে বলতে জহির নৌকার উপর গিয়ে বসলো।
না আনলেই পারতে,শুকনা জিনিস তার মধ্যে আবার পূর্ণিমা রাত!!
“ভয় পেয়ো না তো, চলো তোমার গন্তব্যে চলো।পূর্ণিমা রাত মাছ বেশ ভালোই পাওয়া যাবে! কি বলো সমরেশ দা??”বলল জহির।  
মাথা নারিয়ে সম্মতি দিল সমরেশ। 
চলো গিয়ে দেখি জাল তোলা যাক,প্রায় দু'ঘন্টা হয়ে গেলো জাল তোলা হয় নি। 
গন্তব্যে পৌঁছে দেরি না করে জাল টানতে শুরু করলো সমরেশ ও জহির।  সম্পূর্ণ জাল উপরে উঠলে অবাক হয়ে গেল সমরেশ!! হতচকিত হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ! 
কি ব্যাপার সমরেশ দা অমন তাকিয়ে রইলে যে?
ঘোর কাটিয়ে উঠে উত্তর করলো, জানো জহির ভাই এবছরে এমন মাছ বাজতে দেখিনি! পরক্ষনেই সমরেশ বেশ উৎফুল্ল স্বরে বলল, "তোমার ভাগ্যটা অনেক ভালো জহির ভাই।" 
কি যে বলো দাদা? ভাগ্য ভালো হলে কি আর কুঁড়ে ঘরে রাত কাটাই? পূর্ণিমা রাত তাই জন্য এমনটি।
"তা হতে পারে বৈকি!" উত্তর করলো সমরেশ। 
গল্পে গল্পে রাত আরো গভীর হতে লাগলো।সময়ের দিকে কারও খেয়াল নেই।
নৌকা বয়ে চলেছে অবিরত!
লন্ঠনের তেলও ফুরিয়ে আসতে শুরু করেছে। অদূরে কোন নৌকা চোখে মেলে না।কারও সাজ ঘরের বাতিও চলে না। পাখিরা তাদের ছোট্ট কুটিরে নির্জনে ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু স্রোতস্বিনীর স্রোত বয়ে চলেছে দক্ষিণপানে।

এতক্ষণ চাঁদের আলো নদীর জলে প্রকট ছিল। আস্তে আস্তে তা ক্ষীণকায় হতে লাগলো। চাঁদ যেন তার নিত্যকার কার্য শেষে গায়ে চাদর টেনে বিশ্রামে যাচ্ছে। 

রাত্রি প্রায় দুইটা। এতক্ষণে সমরেশের হুঁশ হলো। এ আমি কোথায় চলে এলাম? সামনে তিন নদীর মোহনা।নদীর তীর ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে প্রকাণ্ড ভয়ানক সেই হিজল গাছ এক নিমিষেই সমরেশ আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। 
জহিরকে ডেকে বললো, ভাই চেয়ে দেখো আমরা কোথায় চলে আইছি! যেখানে মাজেদের রক্তাক্ত -ছেঁড়া শরীর পাওয়া গিয়েছিল! চলো আমরা বাড়ি ফিরে যায়??

জহির বেশ সাহসিকতার সাথে তাকে অভয় দিয়ে বললো, মিছেমিছি ভয় করছো, আমি ও সব ভূত প্রেতে ভয় পাই না।

সমরেশের মনে খটকা লাগতে শুরু করেছে।এর আগে জহির তাকে নদীতে আসার জন্য বিভিন্নভাবে নিষেধ করতো সেই কিনা আজ তাকে অভয় দিচ্ছে।

চারিদিকে অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে লাগলো।অনেক পিরাপিরি করেও জহিরকে ফেরাতে পারলো না সমরেশ। বাধ্য হয়ে সঙ্গ দিতে হলো।

রাত তিনটা। চন্দ্র সম্পূর্ণ গা ঢাকা দিয়েছে। চারিদিকে কালো ঘন অন্ধকার।জলরাশিটুকুও দেখবার উপায় নেই। জহির তার গল্প বন্ধ করেছে। সমরেশের অস্বস্তি লাগছে। 
টিপ টিপ করে জ্বলা লন্ঠনটুকু ধুপ করে নিবে গেল।শান্ত জলে উত্তাল ঢেউ সঞ্চারিত হলো। চারিদিকে ঝরো হাওয়ায় নৌকার পাল ছিড়ে যাবার উপক্রম। সমরেশ প্রচন্ড ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে জাল টানতে টানতে জহিরকে ডাকলো।
প্রত্যুত্তরে কোন সাড়া - শব্দ নেই।
সমরেশ অন্ধকারে উবু হয়ে জাল টানতে পিছনে ভয়ঙ্কর শব্দ উপলব্ধি করলো। কেউ যেন হার চিবিয়ে চলেছে অবিরত। 
সমরেশের আর বুঝতে বাকি রইল না যে সে একটা ছদ্মবেশী পেত্নীর খপ্পরে পড়েছে। হাত থেকে জালটা পড়ে গিয়ে নিমিষেই নদীর অথৈ জলে হারিয়ে গেল।

ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পিছনে ফিরে তাকাতেই দৃষ্টিগোচর হলো সেই বিবর্ণ বিশ্রী চেহারা। সারা শরীর রক্তে মাখা, ফলার মতো দাঁত, মুখের ক্ষতবিক্ষত কাটা ঘা থেকে টপ টপ করে রক্ত ঝড়ছে।

"সমরেশ করজোড়ে বিনয় করতে লাগলো। এবারের মতো আমায় ছেড়ে দাও!!! আমার অপেক্ষায় চেয়ে রয়েছে আমার পরিবার "বলতে বলতে মূর্ছা গেল সমরেশ। 
ভোরে ঘুম থেকে উঠেই জহির ছুটে চললো সমরেশের বাড়ি।সমরেশ বাড়ি ফিরেছে কি-না তা জানতে। রাতে কাজের চাঁপে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল জহির। তাই নদীতে যেতে পারে নি।
খবর নিয়ে জানা গেল সমরেশ এখনো বাড়ি ফিরে নি।জহির ছুটে চললো নদীর পানে।বেশ কয়েক বার হাঁক ছেড়ে সাড়া না পেয়ে ছুটলো হিজল গাছের দিকে।
জহিরের চক্ষু কপালে উঠে গেল!
হিজল গাছের নিচে নৌকার গলুইয়ের উপর পড়ে আছে সমরেশের ভয়ানক রক্তাক্ত দেহখানি।

সামান্য কিছু দানের মাধ্যমে প্রতিদান দিতে হলো একজন স্বপ্নদ্রষ্টা অভিভাবককে। হাজারো স্বপ্নের স্রষ্টা নিপতিত হলো দুর্নিলিপ্ত নদীর পিশাচ গর্ভে
সেই থেকে আর কেউ সেখানে মাছ ধরতে যায় নি!

        

টুনটুনিটা | আতাউর মালেক



টুনটুনিটা গাছের ডালে
ডাকছে খোকা আয়,
পাশেই বসে ছোট্ট সোনা
গুড় মুড়ি খায়!
টুনটুনিটা হাত বাড়িয়ে
বলছে খোকা দাও,
নইকো আমি একলা শুধু
আছে সাথে ছা'ও!
সবাই মিলে সাথি হবো
থাকবো একই সাথে,
মিলে মিশে রইবো মোরা
খাবো একই পাতে!

সমসাময়িক গল্পঃ 'নামটা দেস বাবা' | তিতাস সরকার




'এ বাবা মোর নামটা অ্যানা দেস বাহে- আল্লা তোর ভালো করবে'- স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধির কাছে আকুতি করে বলছেন অসহায় ভিখারি আফিদা বেগম।
ভিক্ষা করে যেটুকু পায় মানুষের দ্বারে দ্বারে- তাই দিয়ে কোনো রকমে খেয়ে পরে বেঁচে আছে সে। বয়স আটষট্টি বছর। কিন্তু তার দিকে তাকালে মনে হবে শত বছর বুঝি ছুঁই ছুঁই। দুই ছেলের ভাগাভাগির বলি হয়ে অবশেষে এই বৃত্তি বেছে নিতে হয়েছে তাকে। ঠিকঠাক না খেতে পেয়ে তার আজ চেহারার এই হাল। শরীরের চামড়া ঢিলে হয়ে গ্যাছে। একটা দাঁতও নেই কোনোকিছু চিবানোর মতো।

করোনা ভাইরাস কী- তার তা অজানা। শরীরে জড়ানো ছেঁড়া ওড়নাটা মাথা ও মুখে ঢেকে লাঠিতে ভর করে আশেপাশের দু'চার বাড়িতে দু'টো চাল জোগাড় করে সে।
আগে তারপরও আশেপাশের গাঁয়ে যেতে পেরেছিলো সে। এখন আর তার উপায়ও নেই। করোনার জন্য ঘর থেকে বেড়োনোই যেখানে দুষ্কর সেখানে আরেক গাঁয়ে যাবার কথা চিন্তাও করা মানা। প্রশাসনের কড়া নজরদারি।
কিন্তু, পেটের জ্বালা কী আর সেই বাঁধা মানে!

একদিন বাজারে একটা মাছ কিনতে এসে হঠাৎ দ্যাখা স্থানীয় ইউপি সদস্যের সাথে। কয়েকদিন থেকে আফিদা বেগম ভাবছেন একটা মাছ কিনবেন। মাছ খান না অনেকদিন হলো। 
অনেকদিন হলো আফিদা বেগম শুনছেন যে, সরকার গরীব ও অসহায় মানুষদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী দিচ্ছেন।
আজকে মেম্বারের দ্যাখা পেয়ে তাকে অনেক অনুনয় বিনয় করছেন একটা কার্ড করে দেয়ার জন্য।

ইউপি সদস্য তার সাথের ছেলেটাকে ভিখারিনী আফিদা বেগমের নামটা লিখে নেয়ার জন্য বলে স্থান ত্যাগ করলেন।
এদিকে ইউপি সদস্যের সাথে আসা ছেলেটা আফিদা বেগমকে চুপিসারে বলল, 'চাচী, ২০০ টাকা দেওয়া লাগবে। তাছাড়া হবে না।'
আফিদা বেগম কিছুক্ষণ চুপ থেকে তার কাছে অনুনয় করে বলল, 'বাবা, মুই গরীব মানুষ, ভিক্ষা করি খাম। ট্যাকা কোনটে পাম বাবা। মোক অ্যাকনা কাট (কার্ড) করি দে বাবা- তোর ভালো হোবে।' 
ছেলেটা তার কথায় কান দিলো না। ২০০ টাকা তার চাই-ই।
আফিদা বেগম তার তার অনেক কষ্টে জোগানো মাছ কিনতে আনা আশি টাকা আঁচলের কোনা থেকে বের করে তার হাতে তুলে দিলো।
ইউপি সদস্যের সেই চ্যালা ছেলেটি তাকে বাকি টাকা ত্রাণ নেয়ার দিন দিয়ে দেয় সে কথা বলে তার নামটা লিখে নিয়ে যায়।
আফিদা বেগমের আর মাছ খাওয়া হলোনা।

আজকে ত্রাণ দিচ্ছে স্কুল মাঠে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মুখ না ধুয়েই রওনা দিলেন স্কুল মাঠের উদ্দেশ্যে।
অনেকক্ষন ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেন তিনি। অনেকেই ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন।
আফিদা বেগমের নাম এলোনা।
ত্রাণের প্যাকেটে দশ কেজি চাল, ১ লিটার সয়াবিন তেল, ১ টা সাবান, ১/২ কেজি ডাল, ২ কেজি আলু, ২৫০ গ্রাম মরিচ।

অনেকক্ষন অপেক্ষা করেও আফিদা বেগম কিছু না পেয়ে মুখ শুকনো করে ঘরে ফিরলেন।
সারাদিন কিছু খায়নি সে। শরীরে প্রচন্ড জ্বর। 
ত্রাণ না পেয়ে মন খারাপ বলে রাতেও ভাত রাধেনি সে। পাশের বাড়ির রহিমের বউ কয়েকটা শুকনো মুড়ি দিয়েছিলো পরশু। তাই খেয়ে মনে কষ্ট নিয়ে শুয়ে পড়লো আফিদা বেগম।
মনে কষ্ট তবুও ছেলেটিকে গালি দিলোনা সে। একবুক কষ্ট নিয়েই দুহাত তুলে প্রার্থনা করলো- 'আল্লাহ তোর ভালো করুক বাবা!'

রাত শেষ হলো। সবাই ঘুম থেকে উঠলো। 
চৌকিদারের দ্বারা ইউপি সদস্য আফিদার বাড়িতে ত্রাণ নিয়ে হাজির খুব সকালেই।
চৌকিদার এসে ভিখারি আফিদা বেগমকে ডাকছে- 'চাচী- এই যে তোমার চাউলের ব্যাগ- ওঠো! ও চাচী, চাচী!'
আফিদা বেগমের ঘুম আর ভাঙলো না।
অনেক ডাকাডাকি করেও যখন ঘুম ভাঙছে না তার- দরজা ভেঙে ছেলেরা ঢুকে দ্যাখে তাদের মা আর বেঁচে নেই।
মুহুর্তেই কান্নার রোল পড়ে গ্যালো।
চৌকিদার ত্রাণের প্যাকেটটি আঙিনায় রেখে চোখ মুছতে মুছতে ডিউটিতে চলে গেলেন!