বিজ্ঞাপন

৬ষ্ট বর্ষে শিশুকিশোর টুনটুনি! টুনটুনির সকল লেখক, পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা!

বিভাগঃ গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিভাগঃ গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

দুঃস্বপ্নের ঘোর | খন্দকার নূর হোসাইন


 

উদ্দেশ্যহীনভাবে শহরের রাস্তায় হাঁটছি, আমি আর আমার বন্ধু। এই ভরদুপুরে কেন যেন রাস্তাটা নিরব নির্জন হয়ে আছে। কিন্তু কেন তা আমি জানিনা। জানার জন্য কোনো মাথা ব্যাথাও নেই আমার। হঠাৎ রাস্তার দুইপাশ থেকে কিছু ছেলে মেয়ে রাস্তায় নেমে এল। ঘিরে ধরলো আমাদের। তাদের হাতে একটা ব্যানার। কিসের ব্যানার তা আমি জানিনা৷ তাদের সাথে কোনো মিছিল বা শোভাযাত্রায় অংশ নিতে হবে। কিসের মিছিল তা জানার কোনো আগ্রহই নেই আমার। যেমন ভাবে ওরা এসেছিলো ঠিক তেমনিভাবে মিছিল শেষ হয়ে গেল। পথের মধ্যে উদয় হলো একটা পুলিশ ভ্যান। হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম, আমি একা দাড়িয়ে নির্জন একটা রাস্তায়। আমার সাথের বন্ধুটি নেই৷ কোথায় সে? আর সেই ছেলে মেয়েগুলো কোথায় হারিয়ে গেল এত তাড়াতাড়ি? এই প্রশ্নও আমাকে চিন্তিত করলোনা৷ সামনে থাকা পুলিশের গাড়িটার দিকে মনোযোগ দিলাম। পর পর পার হয়ে গেল দুটো গাড়ি। কিন্তু কি অদ্ভুত গাড়ি এগুলো । এমন গাড়ি আমি জীবনেও দেখিনি। ট্রাক আর বাসের আকৃতি মিলিয়ে বেশ উঁচু সাইজের অদ্ভুত এক গাড়ি। দেখলে কেন যেন গায়ে কাঁটা দেয়৷ গাড়ি দুটোর দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মনে হল আমার বাড়ি ফেরা দরকার। কিন্তু একি? আমি একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত ডাবল লেনের রাস্তায় দাড়িয়ে আছি। এর দুই পাশে কালো রঙের বহু পুরনো সব দালান৷ এই রাস্তা থেকে বের হতে চাইলাম আমি। অথচ, রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে রাখা একটা ট্রাক। এই ট্রাক আবার কোথা থেকে আসলো? কোনোকিছু চিনতে পারছিনা এখানকার। অচেনা অজানা কোনো শহরে চলে এসেছি আমি। রাস্তার দুইপাশে বাড়ি, তাই রাস্তা দিয়ে সোজা যাওয়া ছাড়া এ রাস্তা থেকে মুক্তি মিলবেনা৷ কিন্তু ট্রাকটা তো রাস্তার মাঝখানেই দাড়িয়ে আছে এখনো। ট্রাকের নিচ দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ওপারে তিন রাস্তার মোড়৷ ট্রাক ও একটা বাড়ির দেয়ালের মাঝখানে হালকা একটু ফাঁকা স্পেস। স্পেস দিয়ে দক্ষিণের রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে। একটা অস্পষ্ট অবয়বের লোককে দেখলাম ওদিকের রাস্তায়। আমার চোখের দৃষ্টি শক্তি কমে গেলো নাকি এখানকার মানুষগুলো এমন তা বুঝতে পারলাম না৷ দ্রুত রাস্তার সাথের একটা বাড়ির গেটের কাছে লুকিয়ে পড়লাম৷ আশা করছি লোকটা আমাকে দেখেননি। এখানকার সবকিছুই অদ্ভুত, তাই কাউকে বিশ্বাস করতে চাইনা আমি৷ যেভাবেই হোক পালাতে হবে এ শহর থেকে। এখনো সেই ট্রাকটা রাস্তায় দাড়িয়ে আছে। উপায় না দেখে রাস্তায় শুয়ে পড়লাম। বুকের উপর ভর দিয়ে গেরিলাদের মতো ট্রাকের নিচে চলে এলাম। হঠাৎ আমার বুকের খাঁচায় বাড়ি পড়লো। শহরটা অন্ধকার হতে শুরু করেছে। আশ্চর্য, একটু আগেও তো দিনের আলো ছিল। তবে কি ওটা শেষ বিকেলের আলো ছিল? না এমনটা হতেই পারেনা। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, দুপুরের টানা রোদ ছিল একটু আগে ৷ কয়েক মিনিটে কিভাবে অন্ধকার হবে? প্রশ্নগুলো নিজেকেই করলাম৷ আমি যে ট্রাকের নিচে শুয়ে আছি, তার দরজা খটাস শব্দে খুলে গেল৷ নেমে এল কালো বুট পরা এক জোড়া পা। লোকটা ট্রাকের আশেপাশে কিছু খুঁজতে  লাগল। সংকিত হয়ে উঠলাম, আমাকে খুঁজছে না তো? মনে হলো এই বুঝি ট্রাকের নিচে উঁকি দিল লোকটা। বুকের কাঁপুনি তখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে আমার৷ কিন্তু না, লোকটা ট্রাকের নিচে উঁকি দিলোনা, চলে যেতে লাগল পশ্চিমের রাস্তার দিকে , আমি শুধু তার কালো জোতা জোড়া ও কালো প্যান্টটা দেখতে পেলাম। লোকটা চলে যাওয়ায় স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেললাম। দক্ষিণের রাস্তায় প্রথম দেখা সেই লোকটা এখনো আছে। না সেদিকে যাবনা আমি। দ্রুত ট্রাকের নিচে থেকে বেরিয়ে দৌড় দিলাম। কিছু দূর দৌড়ে আসার পর যখন বুঝলাম কেউ আমার পিছু নেয়নি, তখন দাড়িয়ে পড়লাম। দুই হাঁটুর উপর শরীরের ভর দিয়ে  হাফাতে লাগলাম। এবার খেয়াল করলাম, আমি আরো কোনো চিপা গলিতে ঢুকে পড়েছি। এই রাস্তার দুই পাশে স্কুলের মতো লম্বা ঘর। এগুলোও কালো রঙের ৷ আশেপাশে ময়লা আর্বজনা পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিন কোনো মানুষ এদিকে আসেনি৷ মনে হচ্ছে কোনো করিডোরে চলে এসেছি। আরো অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশটা। ততক্ষণে  ভয়ঙ্কর সব শব্দ আমার কানে আসতে লাগল। আমি খুব একা এখানে, অজানা কোনো ভূতুড়ে শহরে চলে এসেছি আমি । কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে এটা কিভাবে হলো তা আমি এখনো বুঝতে পারছিনা। এ কেমন সময়ের জালে ফেঁসে গেলাম আমি? আমার বন্ধুটি কোথায় গেল, আমাকে ছেড়ে? এই দুঃসহনীয় পরিবেশে আমি একা। আমি এখানে আর এক মুহূর্তও থাকতে চাইনা। তাকিয়ে দেখি সামনে আর কোনো  রাস্তা নেই। কোথায় যাবো আমি? আমি এটাকে দুঃস্বপ্ন ভাবতে চাইলাম। মুক্তি  পেতে চাইলাম এই স্বপ্ন  থেকে। জোরে একটা চিৎকার দিলাম। ঠিক তখনি নিজেকে চিরচেনা  বেডে আবিষ্কার করলাম। কিন্তু এখানেও বিপদ কমলোনা। আমি দেখলাম আমার বেডে কম্বলের উপর ফুট  তিনেক লম্বা, সাদা রঙের  উপর কালো ফোঁটা  দেয়া একটা সাপ শুয়ে আছে। আমার দিকেই তাকিয়ে  আছে ওটা। আমি নড়তে পারছিনা। শরীরের পেশিগুলো যেন অবশ হয়ে গেছে। তবে কি সাপটা আমাকে কামড় দিয়েছে? আরো ভয় পেয় গেলাম আমি। শরীরের  সমস্ত শক্তি  দিয়ে উঠার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, এবার উঠে বসলাম আমি। তারপর খাট থেকে নেমে সোজা দরজার দিকে দৌড় দিলাম । পরে এসে দেখি বিছানায় কোনো সাপ নেই। মজার ব্যাপার হলো, যখন আমার ঘুম ভেঙেছে ঠিক তখনি দৌড় দিতে পেরেছি। তবে কি এর আগে স্বপ্নেও ঘুম ভেঙে ছিলো? দুঃস্বপ্ন  থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর  শুকরিয়া আদায় করলাম। (সমাপ্ত) 









সবুজ বন্ধু | মুহম্মদ কবীর সরকার



ছোট্ট মেয়ে মীম। কত কিছুই না তার জানার বাকি! বাবা,কখনো মা ও স্যারদের প্রশ্ন করে। দিন দিন যেন তার জানার কৌতূহল বেড়েই চলছে! সব কিছু জানার আগ্রহ দেখে স্যার, বাবা-মা সবাই তাকে ভালোবাসে।  তাই মজা করে স্যার একদিন তাকে ক্ষুদে আইনস্টাইন বলেছিল, সেই থেকে তাকে সবাই ক্ষুদে আইনস্টাইন বলে। এতে মীমের ভালোই লাগে! সবাই তাকে এটা বলে রাগাতে চায় মীম আরো খুশি হয়। অথচ কেউ জানে না আইনস্টাইন কি বা কে!

মীম:স্যার মনে করেন পৃথিবীতে শুধুই একটা গাছ আছে,তাহলে পৃথিবীতে কোনো মানুষ বেঁচে আছে কি?

স্যার : আছে তো?

মীম: কে স্যার?

স্যার: কেন, যে জানে একটা গাছ পৃথিবীতে আছে সে অর্থাৎ যে আমায় প্রশ্ন করে সে-ই মেয়ে, মীম তুমি!

মীম: তাহলে আর কেউ বেঁচে আছে কি?

স্যার: তুমি আমাকে জানিয়েছো গাছটা বেঁচে আছে, তাহলে আমিও তোমার কবীর স্যারও সাথে বেঁচে আছি।তাহলে হবে কি জানো, গাছ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে আর আমরা গাছকে বাঁচিয়ে রেখেছি। গাছের প্রয়োজনে আমরা বাঁচি, আমাদের প্রয়োজনে গাছ বাঁচে।

তখন ক্লাসের সকল ছাত্র-ছাত্রী হাসাহাসির উৎসবে মেতে উঠলো কিন্তু মীম হাসিনি মীম ভাবছে,' হয়তো একটা গাছ থাকলে কোনো মানুষও বাচঁতে হবে অথবা কোনো প্রাণী ।' মীম স্যারকে আবারও প্রশ্ন করলো,স্যার কিভাবে?

স্যার :মীম দেখ, আমরা যদিও গাছের ওপর খাবারের জন্য সরাসরি অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল ঠিক সে-ই রকম গাছ ও আমাদের ওপর সরাসরি না হোক পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। যা আমরা চোখে দেখিনা। আমাদের বেঁচে থাকতে গেলে যেমন,ফল,সবজি ও অক্সিজেন দরকার তেমনি গাছের বেঁচে থাকার জন্য কার্বন ডাই অক্সাইড দরকার। যা মানুষের প্রশ্বাসে বের হয়ে আসে। আর তুমি যেহেতু জানোই একটা বেঁচে আছে তাহলে তুমিও বেঁচে আছো। আজ এখানেই ছুটি...

আজ মীমের জন্মদিন। স্যার মীমকে উপহার দিল একটি পেয়ারা গাছের চারা আর অনেক চকলেট ।মীম অনেক খুশি হল। তার সখ গাছ লাগানো।তার একটা বাগান আছে।সেখানে নানা প্রজাতির গাছ আছে।

মীম স্যারকে জিজ্ঞেস করলো,'স্যার আমার জন্মদিনে গাছ উপহার দিয়েছেন  কেন?'
স্যার বললো, " কেন তুমি খুশি হওনি?"
মীম : অনেক খুশি হয়েছি স্যার।

স্যার বললো,'তুমি তো জানো গাছ আমাদের অক্সিজেন(O2) দেয়।আর অক্সিজেন হল মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রথম ও প্রধান উপাদান। খাদ্যও বলতে পারো। যেমন আমরা খাবার খায় সেই রকম-ই, তুমি একদিন ভাত না খেয়ে অন্য কিছু যেমন কলা, আপেল খেয়ে থাকতে পারো কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য অক্সিজেন ছাড়া থাকতে পারবে না।এর বিকল্পও কিছু নেই। নাক,মুখ চেপে ধর দেখ,বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারবে না।অক্সিজেন আমাদের শ্বাসের সাথে ভিতরে গিয়ে রক্তচলাচলে সহযোগিতা করে। গাছ থেকে যদি আমরা অক্সিজেন না পেতাম তাহলে বেঁচে থাকতে পারতাম না। আর আমি চাই প্রতি জন্মদিনে তুমি নিজ হাতে একটি করে গাছ লাগাও।তাতে করে কি হবে জানো?

-কী হবে স্যার?

তাতে ধরে নিবে তুমি নিজ হাতে গাছ লাগিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন নিজেই যোগান দিচ্ছো।

তাছাড়া প্রতিটি দেশে চারভাগের এক ভাগ অর্থাৎ ২৫% গাছ থাকা দরকার।আমাদের কিন্তু নেই!মানুষ গাছ কেটে কেটে ঘরবাড়ি বানাচ্ছে।

তারপর মীম তার স্যারের সহযোগিতায় বাগানে পেয়ারার চারাটি লাগালো।

মীম জানে গাছকে নিয়মিত পানি দিতে হয়, আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। মীম তাই-ই করতে লাগলো। অবসর সময় পেলে-ই গাছ আর মীম। যেন গাছ তার বন্ধু হয়ে গেল।

অবসরের এক দুপুরবেলায় মীম গেল পেয়ারা গাছে পানি দিতে।

গাছ বললো, 'মীম আমাকে একটু সাহায্য করবা?'

মীম :কী সাহায্য বন্ধু?

গাছ:ইদানীং আমি খাবার তৈরী করতে পারছি না।

মীম: খাবার তৈরী মানে? তোমাদের খাবার তো শুধুই পানি।যা আমি প্রতিদিনি দিচ্ছি। আর কবীর স্যার বলেছিল কার্বন ডাইঅক্সাইডও নাকি খাও।

গাছ: শুধুই পানি-ই আর কার্বন ডাইঅক্সাইড না।আমরা আরো অনেক কিছু-ই খাই! আর আমরা নিজেদের খাবার নিজেরাই তৈরী করি।আমরা তোমাদের ওপর নির্ভরশীল না,বরং তোমরা আমাদের ওপর নির্ভরশীল।যেমন আপেল,কলা, শাক সবজি সব আমাদের দান।

মীম: মিথ্যে বকোনা তো। আমি প্রতিদিন পানি দেয়, আর তুমি বলছো আমি তোমার ওপর নির্ভরশীল?

গাছ : পানি কি তুমি বানিয়ে দাও? আর তোমাদের খাবার তো আমরা উৎপাদন করি! তোমাদের অপ্রয়োজনীয় পানি টুকু আমাদের দিলে-ই চলে।

মীম: তোমার সাথে কথা বলে পারবো না বাপু। আর হ্যা কি জানি সাহায্য চাচ্ছিলে।তাছাড়া তোমরা পানি ছাড়া আর কি খাও?

গাছ: বলছি বাপু বলছি! আমরা পানি ছাড়া সূর্যের আলো ও কার্বন ডাই অক্সাইড খাই। পানি, সূর্যের আলো ও কার্বন ডাইঅক্সাইড(CO2) দিয়ে খাবার তৈরী করি, যাকে বলে সালোকসংশ্লেষন।

মীমঃ কার্বন ডাইঅক্সাইড কী গো চিনলাম না তো?

গাছ: তোমরা যেটা গ্রহণ কর মানে শ্বাস নাও সেটা হচ্ছে অক্সিজেন।আর যে গরম গ্যাসটা বর্জন কর সেটা-ই হচ্ছে কার্বন ডাইঅক্সাইড। যা আমাদের খাদ্য।

মীম: এই তুমি বললে একটু আগে তোমরা আমাদের ওপর নির্ভরশীল নয়, এই তো আমাদের থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড ঠিকি নিচ্ছো।

গাছ : আমরা যদি কার্বন ডাইঅক্সাইড না গ্রহন করতাম তাহলে তো তোমাদের-ই ক্ষতি হত। বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড বেড়ে যেতো অক্সিজেনের অভাবে মারা যেতে। তাছাড়া কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে গেলে মেরু অঞ্চল নামক অঞ্চল আছে যেখানে প্রচুর বরফ আছে, তা গলে সমুদ্রের জল বেড়ে যেত এবং তোমাদের দেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও  নিম্ন ফসলি জমি তলিয়ে যেতো। এই মীম তুমি খবরকাগজ পড়োনা বুঝি। আরো শুনো বিজ্ঞানীরা বলছে, " বর্তমানে যে হা কার্বন ডাই অক্সাইড বাড়ছে তাতে করে সাগরের পানির উচ্চতা ৪৫ সেন্টিমিটার  বেড়ে গেলে  আমাদের ভূভাগের ১০.৯ শতাংশ বন্যায় তলিয়ে যাবে এবং ৫.৫ মিলিয়ন লোক গৃহহীন হবে।"
মীম: এর থেকে বাঁচার উপায় কি বন্ধু? 
গাছ: বিনা কারণে গাছ কাটা চলবে না। অযথা বিদ্যুৎ শক্তি যেমন পাখা, বালব, টিভি লাগিয়ে রাখা যাবে না এবং  মোটরযান গাড়ি কম ব্যবহার করে হেটে অথবা বাইসাইকেল ব্যবহার করতে হবে। এইভাবেই তোমাদের প্রিয় দেশ ও পৃথিবীটিকে তোমরায় রক্ষা করতে পারবে!

মীম: তাহলে আমাদের এখন থেকে কি পদক্ষেপ নিতে হবে?
গাছ:  তোমরা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণি অথবা আরো ছোট ভাইদের নিয়ে স্যারদের সহযোগিতায় বিভিন্ন স্লোগান বানিয়ে সকলকে সচেতন করতে পারো!
মীম: দারুণ আইডিয়া।  আজই বিষয়টি  কবীর স্যার ও প্রধান শিক্ষককে বলবো।
ঠিক আছে তাহলে যায় গাছ বন্ধু! ও হে তুমি  কি যেন সাহায্যের কথা বলছিলে?

গাছ: আমার ওপর সূর্যের আলো পড়ছে না বেশ কিছুদিন ধরে, তুমি যদি ওপরের ঢালটা কেটে দিতে?

মীম: কই! তোমার ওপরে তো রোদ লাগে?

গাছ: ওপরে লাগে পাতায় লাগে না। আমার পিঠ পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তা কোনো কাজে আসে না যদি পাতায় না পড়ে। আমরা সূর্যের আলো খাই অর্থাৎ শোষণ করি গাছের সবুজ পাতা দিয়ে। যাতে থাকে ক্লোরোফিল।ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক আলোকশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে এবং তা উৎপন্ন শর্করাজাতীয় খাদ্যের মধ্যে স্থিতিশক্তি রূপে জমা রাখি। ক্লোরোফিল সবুজ পাতায় আছে। গাছের ছালে বা মূলে নেই।

ছয় অনু কার্বন ডাইঅক্সাইড(6CO 2)

বারো অনু পানি(12H 2 O)

ও সূর্যের তাপ একসাথে মিলে বিক্রিয়া করে গ্লুকোজ( C 6H 12 O 6)

এর সাথে ছয় অনু পানি ও কার্বন ডাই অক্সাইড অনু সমান অক্সিজেন উৎপন্ন করি।

মীম জানো আমরা যতটুকু কার্বন ডাইঅক্সাইড তোমাদের থেকে গ্রহন করি ঠিক ততটুকু অক্সিজেন ত্যাগ করি।

মীম :আজ জানলাম, আর আমরা তো জানতাম, গ্লুকোজ মানেই একপ্রকার মিষ্টি জাতীয় কিছু?আজ জানলাম সেটা তোমরাই উৎপন্ন করো।

গাছ: হ্যা আমরা-ই, প্রতিটি মিষ্টি ফলে গ্লুকোজ থাকে।

মীম: তুমি আমাদের জন্য এত কিছু উৎপাদন করো!

আমি আব্বুকে বলবো ওই গাছের ঢাল টা কেটে দিতে এখন আসি বন্ধু।

এখন মীম বড় ক্লাসে উঠেছে তাই গাছকে সেই রকম গাছের সাথে গল্প জমে উঠেনা, পড়াশোনায় ব্যস্ত। তবুও একবার হলেও এসে দেখে যায়।

মীম স্কুলে যাবে এমতাবস্থায় গাছ ডেকে বললো,' মীম কিগো! সেই সকাল থেকে বসে আছি তোমার সাথে গল্প করবো বলে,আর তুমি স্কুল,প্রাইভেট। আমাকে সময়-ই দিচ্ছো না।

মীম: তুমিও চলে আসো আমার সাথে স্কুলে, বেশ মজা হবে তাইনা? তাছাড়া তোমার গল্প গুলি বড্ড অচেনা ও অজানা হয় গো।

গাছ : বা....ড়ে, আমার যে তোমার মত দুটো পা নেই।শুধুই একটা পা। তাও আবার মাটির নিচে লেগে আছে। আর অজানাকেই তো শুনেছি মানুষ জানতে চাই।তুমি জানতে চাও না?

মীম:চাই তো!তোমার ভাষা কঠিন কিনা!আচ্ছা বাপু, বিকেলবেলায় শুনবো। আমার যে বড্ড দেরী হয়ে যাচ্ছে গো। এখন আসি...।

গাছ: যাও, যাও বিকেল করে আসিও কিন্তু...

বিকেলে মীম আসলো...

গাছ: জানো, আজ সকালে আমাতে মুকুল(ফুলের কলি) এসেছে। বেশ কিছু ফুটেছিলও। জানো সে জন্য মৌমাছি ও প্রজাপতিরা এসে গল্প করে গেছে।

মীম : তাই-ই নাকি! আমরা জানি মৌমাছি মধু খায়, তুমি বলছো গল্প করে করে গেছে।

গাছ: হ্যা ঠিক বলেছো। তবে শুধু মধু-ই খায়না।তারা আমাদের ফুলকে ফলে পরিণত করতে সাহায্য করে।

মীম : দারুণ তথ্য দিচ্ছো বন্ধু। ধন্যবাদ বন্ধু।

গাছ: শুনুইনা।আর তোমরা শুধুই ধন্যবাদ দিতে জানো আর কিছুই পার না। আমাদের ফুলে পরাগরেণু ও পরাগধানি থাকে। যখন মৌমাছিরা মধু খায় তখন তারা পরাগধানী থেকে পরাগরেণু গর্ভমুণ্ডে নিয়ে যায়,তাই ফুল থেকে আমাদের ফল হয়।

মীম: তাহলে কালকে মৌমাছি ও প্রজাপতি আসলে আমার তরফ থেকে সালাম জানিও বন্ধু।

গাছ: আচ্ছা জানাবো বন্ধু।

তারপর মীম আর গাছের মধ্যে কত কথোপকথন যে হল। ফুল থেকে ফল হল। এই ভাবে-ই চলে গেল বেশ কিছুদিন।

তারপর একদিন বিকেলে...

জানো মীম আজ এক ক্ষুধার্ত পাখিকে লাল পাকা পেয়ারাটা দিয়ে দিয়েছি। তুমি রাগ করো নি তো?

মীম: রাগ করবো কেন? তোমার ফল তুমি যাকে খুশি তাকেই দিতে পারো।

গাছ : তুমি তো বলেছিলে নিবে।যাজ্ঞে,জানো পাখিটির কষ্টের কথা শুনে আমিও না করতে পারি নি । সে নাকি দক্ষিণের জঙ্গল থেকে এসেছে। অনেক ক্ষুধার্ত ছিল। সে-ই জঙ্গলে নাকি কিছু দুষ্টু লোক আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। সেখানে পাখিটির দুটো ছানা ও তার স্ত্রী ছিল। তাদের সন্ধান আর সে পাইনি।দুষ্টু লোকেরা অনেক গাছ পুড়িয়ে ফেলেছে।

মীম: তাহলে আব্বু যে বললো প্রতিটি দেশে ২৫ভাগ বন থাকা প্রয়োজন। আমাদের ২৫ ভাগ থেকে ১৭ ভাগ আছে।এর মধ্যে আবার বন ধ্বংস!

গাছ: হ্যা মীম, বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাবে। বাতাস মানুষের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে করে মানুষের মাঝে নতুন নতুন রোগ জন্ম নিচ্ছে।

মীম: তাহলে আমরা কী করবো বন্ধু?

গাছ: বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে, বন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। মানুষকে বুঝাতে হবে গাছের উপকারের কথা। একটা গাছ কাটলে দুটো গাছ লাগাতে হবে।

মীম: আচ্ছা বন্ধু তাই হবে।

তারপর একবছর চলে গেল...

বাবা বাজার থেকে পেয়ারা কিনে আনলো। মীম পেয়ারা দেখে চোখের জল ধরে রাখতো পারলো না। মীমের মনে পড়ে গেল গাছ বন্ধুর কথা। গাছ বলেছিল, 'বন্ধু, তুমি এই পেয়ারাটা খাও,

যাতে আছে ভিটামিন সি। চারটা কমলায় যতটুকু ভিটামিন পাওয়া যায় ঠিক ততটুকু একটা পেয়ারায় পাওয়া যায়।আর ভিটামিন সি শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নতি করে শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তাছাড়া যে কোন ইনফেকশন থেকে পেয়ারা শরীরকে সুস্থ রাখে।' মনে পড়ে গেল সেই স্বজন হারানো পাখিটির কথা।আজ সে-ই পাখিটির মত মীমও তার প্রিয় বন্ধুকে খুঁজে ফিরে আজও।

একদিন বাবা বিল্ডিং তুলবে বলে তার প্রিয় বন্ধুকে হত্যা করলো। কতবার যে বারং করেছিল মীম।তার কথা কেউ শুনেনি।

বাবা এসে মীমকে বললো, 'মীম কাঁদছ কেন? তোমার কি গাছবন্ধুর কথা মনে পড়েছে?'

বাঘ মহারাজ ও বাঁদরের গল্প | মানস রায়

 


দুপুর দুপর আহার সেরে বাঘ মহারাজ নিদ্রা গেছেন সুখে, এমন সময় হঠাৎ একটি বাঁদর কাঁদতে কাঁদতে সটান হাজির হলেন মহারাজের দরবারে। শান্তিপ্রিয় সেই বাঘ মহারাজ কে সে জঙ্গলে মান্য করে সবাই, সব্বাই তার কথা শোনে নির্দ্বিধায়। বেশ গম্ভীর ভাবে বাঘ মহারাজ বাঁদর টিকে জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক কি উদ্যেশ্যে এই ভর দুপুরে বিরক্ত করতে তার এখানে আসা। কিছুটা ভয় পেয়ে যায় বাঁদর, তারপর কাপা কাপা স্বরে বলতে থাকে "মহারাজ, আজ সকালে ছানা তিনটিকে রেখে খাবারের সন্ধানে একটু বেরিয়েছিলাম, এসে দেখি দুটি ছানা বেমালুম উধাও, অনেক ক্ষণ হন্যে হয়ে খোঁজাখুজির পর, দেখতে পেলাম পাশের জঙ্গলের শয়তান বাঘা কচ মচ করে আমার ছানা দুটিকে চেবাচ্ছে "। রাগে গর্জে উঠলেন বাঘ মহারাজ, শয়তান বাঘা এই জঙ্গলে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী , আজকাল জঙ্গলে তার অত্যাচার দিন কে দিন বেড়েই চলছে, নিরীহ পশু পাখি, বাঁদর সমেত কেউই রেহাই পাচ্ছে না বাঘার হাত থেকে। দিন কয়েক আগেই বাঘ মহারাজ ও শয়তান বাঘার মধ্যে একরকম বোঝা পড়া সম্পূর্ণ হয়েছে, কেউ কারো এলাকা ছেড়ে কখনোই বেরোবে না, যে যার নিজের এলাকায় শিকার করবে, তো বাঘার সাহস কিকরে হয়, কথার খেলাপ করে, আমার এলাকায় ঢুকে, আমার জন্তুদেরই হত্যা করে সে। মহারাজ গর্জাতে থাকলেন । মনে মনে ফন্দি আঁটলেন এবারে উপযুক্ত শাস্তি দেবেন বাঘা কে। কিভাবে জব্দ করা যায় তাকে এই ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একদিন বাঘ মহারাজের মাথায় খেলে গেল এক অদ্ভুত বুদ্ধি । দূত মারফত শয়তান বাঘার কাছে বার্তা পাঠালেন মহারাজ, তাকে ভুঁড়িভোজের আমন্ত্রণ জানালেন। খানা পিনায় ওস্তাদ লোভী বাঘা শত্রুতা ভুলে মহারাজের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন এবং নির্দিষ্ট দিনে হাজির হলেন মহারাজের দরবারে। হরেক রকম রান্নার পসরা সাজিয়ে মহারাজ আগাম প্রস্তুত ছিলেন। পছন্দের সব খাবারের পদ দেখতে পেয়ে শয়তান বাঘা এক নিমেষেই প্রায় সব কিছু সাবাড় করে দিলেন। হাপুস হুপুস করে চেটে পুটে বাঘা কে খেতে দেখে পাশ থেকে মনে মনে খিল খিলিয়ে হেসে উঠলেন বাঘ মহারাজ। 
পূর্ব পরিকল্পনা মতন সেই খাবারে মহারাজ, আগাম মিশিয়ে দিয়েছিলেন স্মৃতি শক্তি ও কর্ম ক্ষমতা লোপ করে দেওয়ার কয়েক টি ঔষুধের গুলি। আহার গ্রহণের পর শয়তান বাঘা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয় মহারাজের দরবারে। ব্যাস, ঘুম ভাঙার পর অতীতের যাবতীয় সব স্মৃতি লোপ পেয়ে যায় তার ও কর্ম ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে সে একনিমেষে । এরপর, শেষ মেস
বাঘা তার বাকি জীবনটা বাঘ মহারাজের অনুগত গোলাম হয়েই সে জঙ্গলে কাটিয়ে দেয় । শান্তি ফিরে আসে জঙ্গলে, পশু, পাখি, বাঁদর, হরিণ সমেত সমস্ত জন্তুরা ঠিক আগের মতই সুখ শান্তি ও হাসি খুশিতে দিন কাটাতে থাকলো সেখানে। শয়তান বাঘার শয়তানির ভয় আর রইল না সে জঙ্গলের নিরীহ পশু পাখিদের। 

শিক্ষা :- লোভ ও হিংসা মানুষ কে করুন পরিণতির দিকে ঠেলে দেয় 


মাকড়শা ও মোরগ পোকার গল্প | আশরাফ আলী চারু




রাতে প্রচন্ড   শীলামেঘ হয়েছে। মাঠে ঢেঁড়স গাছে বাস করা মোরগ পোকাটি শীলের আঘাতে একটা পাখায় ব্যথা পেয়ে পানিতে পড়ে হাবুডুবু করছে । পাশের গাছে বাস করা মাকড়শা  বিষয়টা দেখে তার সুতো বের করে মোরগ পোকার সামনে এগিয়ে দিল । সুতো দেখে মোরগ পোকাটি উঠে বসল। ধিরেধিরে সুতোয় উঠতে উঠতে ভাবতে লাগলো আমার কপালটাই খারাপ-পাখা ভেঙে পানিতে ডুবে মরছিলাম , এখন বাঁচার আশায় মাকড়শার সুতোয় উঠলাম । বাঁচার বৃথা চেষ্টা ,  মাকড়শা কি আমাকে বাঁচতে দিবে ?  সেতো আমাকে খাওয়ার জন্যই সুতো বিছিয়ে দিয়েছে । তার কাজই তো হলো সুতো দিয়ে শিকার ধরে খাওয়া । যাই হোক তবু সে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এলো  মাকড়শার কাছে । সামনে এসেই কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই মাকড়শা একটু হেসে বলে উঠলো - ভাই মোরগ পোকা-ভয় পেয়োনা , আমি তোমাকে খাব না।তুমি তোমার বাসায় চলে যাও । মোরগ পোকা মাকড়শার উপকারের কথা আজীবন মনে রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে খুব খুশি হয়ে বাসায় ফিরে এলো । কিছুদিনের মধ্যে সে সুস্থ হয়ে উঠলো । 

কিছুদিন পরের ঘটনা মাকড়শা একদিন পানির পিপাসা মেটাতে ডুবায় গেল। সেখানের এক ব্যাঙ মাকড়শা কে দেখে খাওয়ার জন্য লোভ করল । সে এগিয়ে গেলো মাকড়শাকে ধরবে বলে । ধরবার সমস্ত প্রস্তুতি নিতে লাগলো সে । দূর হতে দেখে  সব বুঝতে পারলো মোরগ পোকা । সে দ্রুত এগিয়ে গেল সেখানে । মাকড়শাকে বাঁচাতে সে তার জীবনের ঝুঁকি নিল ।  একটু দূরে সাঁতার কাটা এক হাঁসের সামনে সে পাখা মেলে অঙ্গভঙি করতে লাগলো যাতে তার উপর হাঁসের চোখ পড়ে। তার ইচ্ছেমতো হাসের চোখ পড়লোও তার উপর।এবার সে পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যেতে লাগলো ব্যাঙের দিকে। হাঁসকে অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে দেখিয়ে সে প্রায় ব্যাঙের  কাছাকাছি চলে এলো । এবার হাঁসের চোখ পড়লো ব্যাঙের উপর ৷ হাঁসতো মহাখুশি । সে পোকার লোভ ছেড়ে ঘাড় বাড়ালো ব্যাঙের দিকে।আর একটু অপেক্ষা ব্যাঙ প্রায় মাকড়শাকে  ধরতে যাবে এমন সময় ঠোঁট হা করে হাঁস এগিয়ে এলো ব্যাঙের দিকে । ব্যাঙ বুঝতে পারলো হাঁস তাকেই ধরতে আসছে ।  ওমনি সে টুপ করে দিল ডুব । মোরগ পোকা পাখা মেলে উড়াল দিলো স্থলের দিকে । মাকড়শা দ্রুত সরে পড়লো সেখান থেকে । ব্যাঙের সাথে সাথে হাঁসও ডুব দিল ডুবার পানিতে । বেঁচে গেল মাকড়শা । 
মাকড়শা মোরগ পোকাকে ডেকে বললো - ভাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তোমার এই উপকারের কথা আমিও ভুলবনা। 

শিক্ষা- পরোপকার। 

সেই থেকে | সিদ্ধার্থ সিংহ


এক ছিল কুকুর। তার ছিল বিশাল জমিদারি। সেই জমিদারিতে অনেক পশুপাখি কাজ করত। প্রধান কর্মচারী, মানে ওই জমিদারের নায়েবমশাই ছিল এক বিড়াল।
একদিন কুকুর মনে মনে ভাবল, বয়স তো অনেক হল, সারা জীবন শুধু বিষয়-সম্পত্তি আগলেই বসে রইলাম। নিজের জমিদারির সীমানার বাইরে গেলামই না। এই দুনিয়ার কিছুই দেখা হল না। চলাফেরার শক্তি থাকতে থাকতে এ বার একটু দেশ-বিদেশ ঘুরে এলে কেমন হয়! সেই সঙ্গে তীর্থ-দর্শনও করে আসা হবে!
বিড়ালের ওপরে সমস্ত জমিদারি দেখাশোনা করার ভর দিয়ে কুকুরমশাই বেরিয়ে পড়ল।
কুকুরমশাই চলে যেতেই বিড়াল ভাবল, এমন মনিবের কাছে চাকরি করি যে, একটা দিনও ছুটি পাওয়া যায় না। এত দিনে একটা সুযোগ পেয়েছি। জমিদারবাবু যখন নেই--- যাই, এই ফাঁকে কিছু দিন দেশের বাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসি। কুকুরের প্রধান বরকন্দাজ ছিল একটা ইঁদুর। বিড়াল তাকে ডেকে বলল, এই শোন, আমি কয়েক দিনের জন্য একটু দেশে যাচ্ছি। আমি যে ক'টা দিন থাকব না, তুই কিন্তু সেই ক'টা দিন এ দিকটা একটু সামলাস। বলেই, বিড়াল দেশে চলে গেল।
এ দিকে এত বড় জমিদারি একার পক্ষে দেখভাল করা সত্যিই খুব কঠিন কাজ। ইঁদুরের ওপর ভীষণ চাপ পড়ে গেল। সে একদিন তিতিবিরক্ত হয়ে ভাবল, সবারই ছুটি আছে, শুধু আমারই নেই, না? ঠিক আছে, আমাকে থাকতে বলেছে তো? আমি থাকব। কিন্তু কোনও কাজ করব না। এই ক'টা দিন শুধু পড়ে পড়ে ঘুমব। 
সত্যিই তাই করল সে। কেবল ঘুমিয়েই দিন কাটাতে লাগল। কোনও দিকেই নজর দিল না। এই সুযোগে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে খেতের সমস্ত ফসল খেয়ে যেতে লাগল।
তার দেখাদেখি বাকি কর্মচারীরাও ফাঁকি দিতে শুরু করল। ফাঁকি মানে, হাজিরা দিতে লাগল ঠিকই, কিন্তু কেউই কোনও কাজে হাত লাগাল না। ফলে জমিদারবাড়িতে অন্য কাজ তো দূরের কথা, ঝাঁট পড়াও বন্ধ হয়ে গেল। যত রাজ্যের ধুলোবালি দিন দিন জমতে লাগল। আগাছায় ছেয়ে গেল গোটা বাগান। নামী দামী ফুলের গাছ শুধু একটু যত্নের অভাবে একেবারে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
দেখতে দেখতে বছর ঘুরতে লাগল। অবশেষে একদিন কুকুরমশাই দেশে ফিরে এল। বাড়ি-ঘর, বাগান আর খেতের অবস্থা দেখে সে তো রেগে একেবারে অগ্নিশর্মা। হুঙ্কার দিয়ে বলল  এ কী হাল হয়েছে আমার বাড়ির? বিড়ালকে সব দেখভাল করার ভার দিয়ে গিয়েছিলাম। তাকে তো দেখছি না। সে হতভাগা গেল কোথায়?
কুকুরমশাইয়ের চিৎকার শুনে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এল ইঁদুর। তাকে দেখে কুকুরমশাই গর্জন করে বলল, এই হল আর এক হতভাগা। আমার বাড়িঘরের এ রকম হাল কেন হল রে? কোনও দিকে নজর দিসনি তোরা, না? বিড়াল কোথায়?
ইঁদুর কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, আজ্ঞে, আপনি চলে যাওয়ার পরেই তো নায়েবমশাই দেশে চলে গেলেন। আমাকে বলে গেলেন, ক'দিন বাদেই ফিরে আসবেন। কিন্তু কোথায়! বছর ঘুরতে চলল, অথচ এখনও তো তার ফেরার কোনও নাম নেই।
কুকুর বলল, যাও। এক্ষুনি তার বাড়িতে যাও। সে যে অবস্থায় আছে, সেই অবস্থাতেই তাকে ধরে নিয়ে এসো। আমি তাকে মজা দেখাচ্ছি।
খানিক বাদেই তার বাড়ি থেকে বিড়ালকে ধরে নিয়ে এল ইঁদুর। বিড়াল আসতেই কুকুরমশাই হুংকার দিয়ে বলল, তোমার ওপরে আমার ঘরবাড়ি আর বিষয়-সম্পত্তি দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলাম। তুমি দেখছি, সেই দায়িত্ব চমৎকার ভাবে পালন করেছ! হতভাগা, তোমাকে আমি কঠিন শাস্তি দেব।
বিড়াল সঙ্গে সঙ্গে ইঁদুরের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, কী রে, কী শুনছি আমি? তোর ওপরে দেখাশোনার ভার দিয়ে দুটো দিনের জন্য আমি একটু দেশে গিয়েছিলাম। আর আমি ছিলাম না বলে তুই কোনও দিকে নজর দিসনি? শুধু ফাঁকি মেরেছিস? দাঁড়া, আমি তোর ব্যবস্থা করছি। বলেই, ইঁদুরের দিকে তেড়ে গেল বিড়াল। ইঁদুর তো বেগতিক দেখে দে ছুট। বিড়ালও তার পেছনে ধাওয়া করল। কিন্তু তাকে ধরতে পারল না। সরু গর্তের মধ্যে ঢুকে ইঁদুর উধাও হয়ে গেল।
বিড়াল চিৎকার করে বলল, পালাবি কোথায়? একদিন না-একদিন তো তোকে হাতের কাছে পাবই, তখন একেবারে মজা দেখিয়ে ছাড়ব।
ওর কীত্তি দেখে কুকুরমশাই বলল, শোনো, ইঁদুরকে তো আমি কোনও দায়িত্ব দিয়ে যাইনি। কাজেই ওকে আমি কিছু বলব না। আমি তোমাকে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলাম, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করোনি। ফলে ওকে নয়, আমি তোমাকেই সাজা দেব। কঠোর সাজা। বলেই, এক লাফে কুকুরমশাই ঝাঁপিয়ে পড়ল বিড়ালের ওপরে। ঘাড় মটকে দেবে বলে। সেটা টের পেয়েই নিজের প্রাণ বাঁচাতে পাইপাই করে বনের দিকে ছুটতে লাগল বিড়াল। কুকুরমশাইও তার পিছু ছাড়ল না। বিড়ালও দৌড়তে দৌড়তে শেষ পর্যন্ত একটা উঁচু গাছের মগডালে উঠে পড়ল। 
কুকুরমশাই তখন হাপাতে হাপাতে বলল, আচ্ছা, আমাকে ফাঁকি দিবি ভেবেছিস? ঠিক আছে, তুই তো আর চিরকাল গাছের উপরে বসে থাকতে পারবি না, তোকে একদিন না-একদিন নীচে নামতেই হবে, তখন?
সেই থেকে শুরু হল কুকুরের সঙ্গে বিড়াল আর বিড়ালের সঙ্গে ইঁদুরের শত্রুতা। সেই শত্রুতা আজও সমানে চলেছে। তাই আজও ইঁদুরকে দেখলেই বিড়াল তাড়া করে। আর বিড়ালকে দেখলেই কুকুর। অথচ ইঁদুর আর কুকুরের মধ্যে কিন্তু কোনও শত্রুতা নেই। অন্তত আজ পর্যন্ত তো নেই-ই।

অনুগল্পঃ ছিপ ও পুঁটিমাছ | বোরহান উদ্দিন












- মা, মা, কোথায় তুমি?
- এইতো বাবা আমি বাহিরে। কখন এলে তুমি?
- এখন এসেছি। এদিকে আসো।
- আসছি।
বলে মা ছন্টুর কাছে আসছে। আর ছন্টুর এটা প্রতিদিনের অভ্যাস। স্কুল থেকে এসে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে মাকে ডাকতে থাকবে। মনে হয় কতদিন মাকে দেখেনি। মা জানে ছেলের এমন অভ্যাস। কি আর করা। আজ বৃহস্পতিবার। হাফবেলা স্কুল, ছুটি হয়েছে তাড়াতাড়ি। কাঁধের ব্যাগ খুলে বিছানার উপর রেখে দিল। তারপর মা এসে সব গুছিয়ে রাখল। মা বললঃ তুমি মুখহাত ধুয়ে খেতে আসো। এরপর ছন্টু খাবার টেবিলে বসেই খোঁজা-খুঁজি শুরু করলো কিন্তু কথাও পেলো না। মা বুঝতে পেরে বললঃ আজ নেই। আজ বাজারে তোমার বাবা পুটিমাছ পায়নি।
- তাহলে আমি কি খাবো।
- যা আছে তাই দিয়ে খেয়ে উঠো।
কিন্তু ছন্টু খাবার টেবিলে বসেই রইলো। খাবার তার মুখের ভেতর যাচ্ছেই না। পুটিমাছের মচমচে ভাজি ছন্টুর প্রিয়। কিন্তু আজ সেটি নেই। রুই মাছের দোপেয়াজা দিয়ে একটু খেয়ে উঠল। কিন্তু মন খারাপ  করে বসে আছে। হঠাৎই মনে পড়ল পুটিমাছতো আমাদের পুকুরেই আছে। কিন্তু কি করে ছন্টু ধরবে। যেই ভাবা সেই কাজ, মাথায় বুদ্ধি চলে এলো। কিন্তু ছন্টুর তো নেই। ছন্টু তার পাড়ার ছেলে ফন্টুর কাছ থেকে মাছ ধরার ছিপ নিয়ে আসলো। এরপর সামান্য ময়দা দিয়ে মাছ ধরার টোপ বানালো। তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে এসে বসলো পুকুর পাড়ে। তারপর বরশির মাথায় ময়দা লাগিয়ে পানিতে ছুঁড়ে দিল।
পুটিমাছের দল দেখতে পেলো পানির ভেতর ময়দা ঝুলে আছে। ওদের মধ্যে একটা কৈ মাছ ছিল। চালাক কৈ পুটিমাছদের বললঃ তোমরা এখানেই থাকো। এটা আমাদের জন্য ফাঁদ। যা করার আমিই করবো। এইবলে সে টোপের কাছে এসে আস্তে আস্তে ঠুকিয়ে ময়দা গুলো খেয়ে ফেলল। পানির উপর বরশির ফাঁতা নড়েচড়ে উঠল। ছন্টু বরশী তুলে দেখে টোপ নেই। টোপ লাগিয়ে আবার পানিতে ছুঁড়ে মারে। এভাবেই বেশ কিছু সময় চলে যায়। কিন্তু ছন্টু একটি মাছ ও পায়না। এরপর ছন্টু বুদ্ধি করে বরশীর মাথায় সামান্য তুলা পেচিয়ে তার উপর ময়লা লাগিয়ে পানিতে ছুঁড়ে দিল। এবার কৈ মাছ এসে টোপের ময়দা খেতে লাগলো। একটু পরে তুলা বেরিয়ে পড়লো। কৈ ওটাকে ময়দা ভেবে ঠোকাতে শুরু করল। এক সময় কৈ আটকা পড়ে গেল। এরপর নিজেকে ছাড়াতে যখনি বরশি টেনে নিচ্ছিল। তখনি ছন্টু ছিপ টেনে উপরে উঠালো। ছন্টু দেখলো একি এতো পুটিমাছ নয়, এটা কৈ মাছ।
কিন্তু ছন্টু তো পুটিমাছ ধরতে এসেছে। এরপর ছন্টু আবার বরশি ফেলে। এবার পুটিমাছ ধরা পড়ে। এভাবেই পরপর বরশি ছুঁড়ে অনেকগুলে পুটিমাছ ধরে ফেললো।
পাত্রে করে কিছু আনতে দেখে মা বললঃ ছন্টু, ওগুলো কি বাবা।
- মা, এগুলো আমাদের পুকুরের মাছ। বরশি ফেলে ধরেছি।
মা আপ্লূত হয়ে বললঃ খুব ভালো করেছ বাবা। তুমি তো নিজে চেষ্টা করতে শিখেছ। মা আদর করতে থাকে ছন্টুকে। এরপর ছন্টু মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে থাকে।

গল্পঃ কালো বিড়াল | মোহন মিত্র


                                
রনৌলি থেকে বনকুলে যাওয়ার পথটা বড় নির্জন। রনৌলি বাস স্ট্যান্ড থেকে যে রাস্তাটা পশ্চিম দিকে গেছে সেদিকে একটা হাটখোলা আছে। সপ্তাহে দুদিন হাট বসে। সোমবার আর শক্রবার। তারপরে আট দশটা বাড়ি নিয়ে একটা পাড়া। পাড়াটার নাম পশলা। পশলা থেকে বেরিয়েই অনেকটা ফাঁকা রাস্তা। দুই ধারে ধূধূ মাঠ। কিছুদুর এগিয়ে গেলে আসে একটা ছোট নদী। শীতকালে হাঁটুজল থাকে। লোকে শর্টকাট খুঁজতে হাটুজল পেরিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু বর্ষাকালে দুকুল ছাপিয়ে যায়। তখন নদী পারাপারের জন্য গ্রামের লোকেরা বাঁশের পুল বানায়। জলের স্রোতে পুল কাঁপতে থাকে। হাতল হিসাবে ধরার জন্য থাকে দুধারে বাঁশের রেলিং। তার নীচ দিয়ে পা ফসকে পড়লে আর রক্ষে নেই। সেই পুল পেরিয়ে এলে পরে একটা গ্রাম, গোশালা। মাঝি, মাল্লা, ঢাকি, জেলে, এবং জন মজুর খেটে খাওয়া মানুষদের বাস। ছোট ছোট ঘর। কোথাও একচালা কোথাও দোচালা। গোশালা গ্রামের ভেতর দিয়ে রাস্তা। অবৈধ দখলে রাস্তাটা সরু এবং অত্যন্ত নোংরা। চারিদিকে নর্দমা, গোবর এবং আবর্জনায় থিকথিক করে। বিশ্রী গন্ধ। হেঁটে পার হতে দম বন্ধ হয়ে আসে। গোশালার পরে শুরু হয় ঘন আম বাগান, বাঁশ বাগান। একদেড় ফুট উঁচু মাটির রাস্তা। লোকে বলে সড়ক। দুধারে বড় বড় আম গাছ। কোথাও কোথাও বাঁশ ঝাড়। আম গাছের আসেপাশে নানা রকম ছোট ছোট জংলি গাছের ঘন ঝোপঝাড়। সন্ধ্যের পর সে রাস্তা দিয়ে যেতে হলে গা ছমছম করে। বাঁশের ঝাড়ে একটু হাওয়া লাগলেই নানা রকম আওয়াজ হয়। ঝির ঝির, শির শির, ক্যাঁচ ক্যাঁচ। জোনাকিরা এত ভিড় করে মনে হয় আকাশের তারারা মাটিতে নেমে এসেছে। আম বাগানের মধ্য দিয়ে একটু এগিয়ে এলে রাস্তার এক্কেবারে ধারে দেখা যায় একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছ। হাওয়া না থাকলেও তার পাতা নড়তে থাকে, অদ্ভুত আওয়াজ বের হয় সেখান থেকে। এখনও আছে সে গাছ। সেই গাছের দক্ষিনে একশ গজ দূরে মুসলমানদের কবরস্থান। সেই কবরস্থান এবং অশ্বত্থ গাছ নিয়ে বহু কাহিনী বংশপরম্পরায় প্রচলিত আছে। সেগুলি আমরা অনেক শুনেছি। ছোটবেলায় সেখান দিয়ে যাবার সময় বড়রা রামনাম জপতে জপতে যেত আর আমরা ছোটরা তাদের জরিয়ে ধরে, প্রায় চোখ বন্ধ করে পার হতাম।

আসলে ওখানে এলেই মনে পড়ত, কে কবে কাকে হঠাৎ গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতে দেখেছিল। কেউ আবার কাউকে গাছের উপরে বসে কাঁদতে দেখেছে। কখনও আবার কেউ কাউকে এগিয়ে দিয়ে গেল। কেউ আবার ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। সব চেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হোল সেই দেখতে পাওয়া লোকগুলো সবাই মৃত। তারাই নাকি কবরস্থান থেকে উঠে এসে এই সব করে। তার মানে এই সব ঘটনা ভূতের। সত্য বা মিথ্যা জানিনা। কিন্তু, আজও যখন গ্রামে যাই, সে স্থান এলে আমরা নিজের অজান্তে হঠাৎ যেন চুপ করে যাই, গা শিউড়ে ওঠে। উঠতি বয়সে যখন ভয়কে জয় করার উদ্দাম সাহস দেখানোর চেষ্টা করি, নিজেকে বড় প্রমান করার চেষ্টা করি, সে সময় আমরা একাই যাতায়াত করতে শুরু করি।

সাধারন ভাবে লোকেরা রনৌলি থেকে সন্ধ্যের পর বনকুলে ফিরলে একজন অন্তত সাথী খুঁজেই পথ চলতে শুরু করত। কিন্তু আমরা তখন গ্রামের উঠতি হিরো। তখন আমরা হাতের কনুই বাঁকিয়ে, কব্জিটা একটু ট্যারা করে বুক ফুলিয়ে হাঁটি। যেমন মস্তানেরা হাঁটে আর কি! সে বয়সে আমাদের সাথী খোঁজার অর্থ হোল আমরা এই ভৌতিক কান্ডকারখানায় বিশ্বাস করি এবং প্রশ্রয় দিই। সেটা কিছুতেই বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে মানতে পারিনা। তাই সাহস দেখাতে অনেক সময় এক্সট্রা কভার ড্রাইভ মেরে বসি। সেই রকম একটা ঘটনার কথা বলি।

সরস্বতী পুজোর রাত। আমি তখন নবম শ্রেনীর ছাত্র। গ্রাম থেকে এক মাইল দূরে  রনৌলিতে আমাদের কো-এডুকেশন স্কুল। বাড়িতে সরস্বতী পুজো হলেও স্কুলের পুজোয় ছাত্রদের থাকতে হত। তাছাড়া নিয়ম অনুযায়ী নবম শ্রেনীর ছাত্ররা পুজোর সম্পূর্ণ দায়ীত্বে থাকে। সেদিন আবার সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমাদের নাটক ছিল। আমাদের সংস্কৃত পন্ডিতমশাইয়ের লেখা নাটক ভারতমাতা। আমি কনিষ্কর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। আমাদের গ্রামের একটা মেয়ে বুলু হয়েছিল ভারতমাতা। যেমনটা হয়, নাটক শুরু হয় সবার শেষে। শেষ হতে রাত প্রায় দশটা। ড্রেস চেঞ্জ করে যখন বাইরে এলাম আমাদের গ্রামের ছেলেরা এবং দর্শকদের প্রায় সবাই চলে গেছে। অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রী ভারতমাতা মুখের রঙ উঠিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে তখন আমার সাথে। আমরা দুজনে যাব বলে স্কুল থেকে বেরিয়েছি। দুজন আছি তাই ভয়ের কিছু নেই। এমন সময় ধীরেনকাকা মানে বুলুর বাবা সাইকেল নিয়ে হাজির হলেন বুলুকে বাড়ি নিয়ে যেতে।
ধীরেন কাকা, আর সবাই কোথায়? বুলু চলে আয় আমার সাইকেলে
বুলু আমার দিকে একটু করুণ চোখে তাকাল। কী ভেবে জানি না।
আমি বললাম, তুই চলে যা সাইকেলে তোর বাবার সাথে। আমি হেঁটে আসছি
ধীরেন কাকা বুঝলেন আমি একা আছি। তাই তিনি অবশ্য আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুই একলা আসতে পারবি তো, অমল? নাকি সবাই মিলে হেঁটে যাব?
আমি স্টাইল মেরে বলেছিলাম, না কাকা, তোমরা চলে যাও। আমি চলে যাব

বুলু চলে গেল ওর বাবার সাথে। আমি একা হন হন করে হাঁটতে লাগলাম। আমাদের স্কুলটা ছিল বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি। হাঁটখোলা থেকে বেরিয়ে বাঁ হাতে রাস্তার ধারে আছে একটা কালীবাড়ি। সবাই বলে খুব জাগ্রত মা কালী। ঐ অঞ্চলে সবার  শুভ কাজ শুরু হয় সেখানে পূজো দিয়ে। কেউ কোন সমস্যায় পড়লে তাঁকেই আগে স্মরণ করে। আমরাও ছোটবেলা থেকে তাই করে আসছি। কালীমাতার আদেশে কোন মন্দির তৈরী হয়নি। ঘন জঙ্গলে ঘেরা সুন্দর এক পবিত্র স্থান। সেখানে প্রস্তরখন্ড রূপে মা বেদীতে আধিষ্ঠিতা। হয়ত কোন এক সময়ে পাথরের পূর্ণ মূর্তি ছিল, কালে ক্রমে সেটা ভেঙে ঐ রূপ পেয়েছে। তাতে মানুষের মনে ভক্তির কোন খামতি হয়নি। যাওয়া আসার পথে মানুষ ভক্তিভরে একবার মা কালীকে স্মরণ করে। আমিও মনে মনে একবার মাকে স্মরণ করে হাঁটতে লাগলাম। গ্রামের রাত দশটা মানে নিশুতি রাত। ভয় তো লাগেই। কাউকে বুঝতে না দেবার চেষ্টা করি। সামনে দূরে গোশালা গ্রামের একআধটা বাড়ি থেকে একটু আলো দেখা যাচ্ছে। দূরের গ্রামে কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। দুএকটা ছোট বাচ্চা কাঁদছে তার ক্ষীণ আওয়াজ আসছে। দ্বিতীয় প্রহরের শেয়ালের হুক্কাহুয়া শেষ হয়ে গেল। আমি এক মনে মনে হেঁটে চলেছি।

পেছনে একটা সাইকেলের ঘন্টা বাজলো। আমি পাশে দাঁড়ালাম রাস্তা ছেড়ে। না হলে হয়ত অন্ধকারে আমার ঘাড়েই উঠে পড়বে। আমার এক্কেবারে পাশে এসে সাইকেল আরোহী জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলো, কে অমল? তুই এত রাতে একা কোথা থেকে? তাঁকে চিনলাম। আমাদের গ্রামের রঘুদা। রনৌলিতে বুলুর বাবা ধীরেন কাকার বিদেশী মদের দোকানে কাজ করে। ধীরেনকাকা আগে বেরিয়ে এসেছেন। তাই সে দোকান বন্ধ করে একা ফিরছে। তার মুখ থেকে একটু হুইস্কির গন্ধও পেলাম। মালিক নেই দেখে নিশ্চয় মেরে দিয়েছে একদু পেগ। রাতে তার ঘুমটা ভালোই হবে।

আমি বললাম, স্কুলে সরস্বতী পুজোর জন্য দেরী হয়ে গেল, রঘুদা
রঘুদা জড়িয়ে আসা গলায় শুধাল, তুই একা আসতে পারবি তো? নাকি আমিও হাঁটব তোর সাথে?
গ্রামের লোকেদের এই আপন বোধটাই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মত। আজও মনে পড়ে সে সব কথা। শহরের যান্ত্রিকতায় লোক হ্যালো বলতেই সময় পায়না।
বললাম, না, না, রঘুদা, তুমি চলে যাও। এই তো অর্ধেক পথ চলে এসেছি। বাকিটা চলে যাব

রঘুদাও টিং টিং ঘন্টি বাজাতে বাজাতে চলে গেল। সম্ভবত সেই ছিল শেষ যাত্রী আমাদের গ্রামে যাওয়ার। আমি সেই বিখ্যাত গোশালা গ্রামে ঢুকলাম। নোংরা আবর্জনা জর্জরিত পথটা তাড়াতাড়ি পার হতে হবে। সেখানেও এক দুজন জিজ্ঞেস করল, অমল বাবু, নাকি? যেতে পারবেন একা? বলেন তো এগিয়ে দিয়ে আসব। ওরা সবাই আমার বাবার অনুগত। আমাদের আপনজন। আমি বললাম, না গো, এইতো বাড়ি এসে গেছি প্রায়

ওদের গ্রামটা পেরিয়েই আম বাগান, বাঁশ বাগান শুরু হয়ে গেল। চলবে আমাদের বাড়িতে ঢোকার ঠিক আগে পর্যন্ত। একটু এগোতেই এসে গেল সেই অশ্বত্থ গাছ। যদিও মনের কোণে আগেই এসেছিল তার অস্তিত্ব। দূর থেকে তার পাতার শিরশির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তাকিয়ে দেখলাম আকাশ ভর্তি অসংখ্য তারা। সবুজ পাতা কালো কালো দেখাচ্ছে। আমার মনের মধ্যে অনেক বার শোনা গল্পগুলি ভির করতে লাগলো। জোর করে মনকে শক্ত করছি। গুণ গুণ করে গান গেয়ে ভয়কে জয় করার অহেতুক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম যেতে তো হবেই। যা হয় হোক।

গাছের তলায় আসতেই যেন মনে হোল গাছটার পাতাগুলো বেশী জোরে নড়ছে। কিন্তু তেমন জোরে তো হাওয়া বইছিল না। সারা গায়ে একটা ভয় মিশ্রিত শিহরণ অনুভব করলাম। গাঁয়ের রোম খাড়া হয়ে উঠল। কোনদিকে না তাকিয়ে রাস্তা দিয়ে চলতে লাগলাম। মা বলতেন, কখনও ভয় পেলে রাম রাম বলবি। সব ভয় কেটে যাবে। আমিও মনে মনে রাম, রাম বলতে বলতে হাঁটছিলাম। কোথাও কোন লোকের সারা নেই। কোথাও কোন শব্দ নেই। শুধু আমার পায়ের জুতোর দুপদাপ আর রেয়নের প্যান্টের খসখস শব্দ শুনছি। আমি একা সেই অন্ধকার রাতে বিশাল আমবাগানের রাস্তায় একঝাঁক জোনাকির মাঝে হেঁটে চলেছি। মনে দারুন অজানা সংশয়। ঐ নিস্তব্দতার মধ্যে একবার মনে হল কেউ যেন আমার পেছনে আসছে। কিন্তু কোন কারণেই পেছনে তাকানো যাবেনা, বড়রা বলে দিয়েছেন। পেছনে তাকালেই সে ঘাড় মটকে দেবে। গায়ের রোম আগেই খাড়া হয়ে ছিল, মনে হল কেউ যেন ফিসফিস করে কানের কাছেই কিছু বলাবলি করছে। আমি আমার হাঁটার স্পিড বাড়ালাম। হৃদপিন্ডের স্পীড তো আগেই বেড়ে গেছে। যতটা সম্ভব দৃষ্টি রাস্তাতেই নিবদ্ধ রেখে চলছিলাম। এ পাশ ও পাশ দেখাও বিপজ্জনক বলেই শুনেছি। এখনও আটদশ মিনিটের পথ বাকী। হঠা চোখের কোন দিয়ে দেখলাম ঠিক আমার ডানদিকে রাস্তার নীচে একটা কালো বিড়াল আমার সমান্তরালে হাঁটছে। ওটার গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। আমার দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে হাঁটছে। ওর চোখদুটো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছিল। ভয়ে আমার গা  দিয়ে ঘাম ছুটছিল ওই শীতকালেও। আমি সোজা হাঁটছিলাম এইভেবে যে ওটা হয়তো অন্যদিকে চলে যাবে। কিন্তু না, ওটা ঐ ভাবেই চলছিল। মুহূর্তের মধ্যে কালো বিড়ালের ভুতুরে গল্পগুলো, যা শুনেছিলাম আগে, মনে এলো। আমার সব সাহস মুহূর্তের জন্য উবে গেল

কী যে হল আমার মনে নেই। আমার ভেতর থেকে একটা প্রচন্ড জোরে চিৎকার বেরিয়ে এলো বিড়ালের দিকে চোখ রেখে। সেই চিৎকার আমি আর কোনদিন বের করতে পারিনি। আমি দেখলাম আমার ঐ গলা ফাটানো চিৎকারে বিড়াল কোথায় উধাও হয়ে গেছে। আমার ভয় কিন্তু ছিলই যদি আবার ফিরে আসে। যতটা সম্ভব জোর কদমে হাঁটতে লাগলাম। দৌড়ানো যাবেনা। দৌড়ালে নাকি ওরা আরও পেয়ে বসে। ততক্ষনে বাড়ির আলো দেখতে পেয়ে গেছি। বেড়ে যাওয়া হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হতে লাগলো। বাড়িতে পৌঁছে অনেকক্ষন চুপ করে বসেছিলাম। মা বুঝতে পেরেছিলেন আমি ভয় পেয়েছি। আমার মাথায় ঠাকুরের পুষ্প ঠেকিয়ে বলেছিলেন, রাত বিরেতে এখানে সেখানে একা একা যেতে হয় না। কতকিছু অতৃপ্ত ঘুরে বেড়ায়

পরে অনেকবার  রাস্তায় একা একা অনেক রাতে এসেছি। আর কখনও সেরকম কোন পরিস্থিতির মধ্যে পড়িনি। সেই কালো বিড়ালের রহস্য আমি আজও বুঝতে পারিনি – বিশেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে একটা দূরত্ব রেখে বিড়ালের চলাটা কখনই স্বাভাবিক ছিলনা।
লেখকঃ
মোহন মিত্র, 
১৩সি/১৩, অনুপমা হাওজিং কমপ্লেক্স,
ভি আই পি রোড, কোলকাতা  ৭০০০৫২
মুঠোফোন - ৯১৬৩৭৮০৭৫১