বিজ্ঞাপন

৬ষ্ট বর্ষে শিশুকিশোর টুনটুনি! টুনটুনির সকল লেখক, পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা!

একগুচ্ছ ঈদের ছড়া | আতাউর মালেক



১- 'স্বপ্ন ভাসে মায়ের চোখে'


রাতের বেলা চাঁদের আলো

ঝকমকিয়ে উঠে,

খোকন সোনা মায়ের কোলে

দেখছে খুঁটে খুঁটে!

বলছে মাকে, চাঁদটা মাগো

জ্বলছে কেন বলো,

চলোনা মা সেথায় গিয়ে

একটু ঘুরি চলো!

চাঁদে নাকি কোনসে বুড়ি

মিটমিটিয়ে হাসে,

পেঁজাতুলো মেঘেরা সব

কেমনে দেখি ভাসে!

খোকার এমন কথায় বাঁনে

ভরে মায়ের বুক,

স্বপ্ন ভাসে মায়ের চোখে

আসছে ঘরে সুখ! 


২-'বলছে মাকে, ঈদটা মাগো'


খোকা বাবুর মনটা ভারী

বলছে না সে কথা, 

এই করোনায় মরলো অনেক

তাইতো মনে ব্যথা! 

ছোট্ট খোকা করবে কী আর

ছোট্ট মাথা তার, 

বলছে মাকে, ঈদটা মাগো

করবো না এবার! 

দেখছো না মা!  আহাজারি 

দুনিয়া জুড়ে আজ,

পায় না তারা চিকিৎসাটাও

করুন কিযে সাজ! 

হাতটি রেখে খোকার মাথায়

রবকে ডাকে মায়ে, 

শান্ত করে দাও না খোদা 

তোমার শিতল ছাঁয়ে! 



ভূতের বাবার জ্বর | পলাশ পাল

 



ভূতের বাবার জ্বর এসেছে,
ঘন বর্ষায় ভিজে।
ভূত পরিবার এলো ছুটে,
করবে এখন কি যে।

বয়স বেড়েছে গরীব বাবার,
পরিবার পথে বসে।
ঠেলায় পড়ে কুঁড়ে ছেলে
জমিতে লাঙল চষে।

ভূতের রাজ্যে বড়ই অসুখ,
খাবারের বড্ড অভাব।
গভীর রাতে চুরি করা,
অদ্ভুত ওদের স্বভাব।

ভূতের বাবার যে জ্বর এসেছে,
বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে।
ভূত কবিরাজ এসেই গেলো
জংলী পাতা নিয়ে।


নাম: পলাশ পাল
ঠিকানা: মানকুন্ডু পালপাড়া লেন, হুগলী
মোঃ ৮৯৮১২৪২৮৭৪

শিশু-কিশোর | রাসেল খান

 



তোমরা যারা শিশু-কিশোর 
বদ্ধ ঘরে থাকো, 
মনের মাঝে স্বপ্ন হাজার 
রং তুলিতে আঁকো। 

হয় না দেখা ইচ্চেমতো
খোলা আকাশটাকে, 
ঢেউয়ের খেলা কেমন করে
নদীর বাঁকে বাঁকে?

গাছের পাতা ঝিরিঝিরি 
দুলে জুড়ায় প্রাণ,
হয় না শোনা পাখির ঠোঁটে 
অবাক করা গান। 

মন জুড়ানো স্নিগ্ধ পরশ 
আকুল হয়ে আসে,
হয় না হাঁটা খালি পায়ে
কোমল দূর্বাঘাসে।

সবুজ মাঠের পথটি ধরে
শাপলা বিলের ঘাটে,
হয় না ছে‌াটা বিকেলবেলা 
খেলতে গাঁয়ের মাঠে। 

শিউলি পলাশ গোলাপ বেলি 
হাজার ফুলের ঘ্রাণে, 
হয় না ছোটা একটুখা‌নি
সুবাস মাখি প্রাণে। 

মন হাসে না র‌বির আলোয়
বন্দি থেকে ঘরে, 
স্বপ্নগুলো গুমরে কাঁদে 
অঙ্কুরে যায় মরে।

খুকির দুর্গা পূজো | দ্বীন মোহাম্মাদ দুখু




খুকি বসে কাঁদছে দেখো
একলা ঘরের কোণে,
পূজোয় জামা পায়নি খুকি
দুঃখ হাজার মনে।

দুর্গা মায়ে এবার বাড়ি
রাখবে নাকো চরণ,
অর্থ কড়ি নাইকো ঘরে
বইছে দুঃখের ত্বরণ।

হাজার স্বপন মনে খুকির
পূরণ হলো না আর,
রেগেমেগে খুকি বলে
করোনা দেশটা ছাড়! 

হবেই পুজো আমার গ্রামে | তুহিন কুমার চন্দ


ঢ্যাম কুড়াকুড় ঢ্যাম কুড়াকুড়
বাদ্যি বাজে পুজোর ঢাকে
কি পুজো ভাই বাজনা বাজাই
পুতুল সাজাই নদীর ঘাটে।

বসবে মেলায় কুকুর খোলায়
গয়না গাটি শীতলপাটি
রান্না করার হাড়ি পাতিল
খেলনা পাতি মাটির বাটি।

পাগলা ভোলা দরাজ গলা
বৃষ্টি ভিজে নিচ্ছে খুঁজে
কোন মাটিতে গড়বে পটো
দুগগা মায়ের মূর্তি নিজে।

চালায় নিজের টায়ার গাড়ি
কাল দিয়েছে নিতাই কাকা
কুকুর খোলায় খেলছে ভোলা
ফেলে দেয়া টায়ার চাকা।

পুজো হবে পুজো হবে
ছুটছে ভোলা বাঁশবাগানে
সাফ করে নাও এই এখুনি
জমবে মেলা যাত্রাগানে।

পুকুর পাড়ে বৃদ্ধ হাড়ে
একলা চলে বিপিন খুড়ো
হবেই পুজো আমার গ্রামে
তাই বসে খাই মাছের মুড়ো।

শিউলি সুবাস | সবিতা বিশ্বাস



কালো মেঘেদের তাড়িয়ে দিয়েছে সাদা মেঘেদের দল
ঝির ঝির ঝির বইছে ওই অঞ্জনা নদীর জল
আর দেরী নেই মোটে
সিরাজ ধীরাজ পদ্ম তুলছে কলার ভেলার বোটে

কাশের গুচ্ছ দুলছে দোদুল রেললাইনের ধারে
তনিমা জরিনা ধরছে ফড়িং তাইরে নাইরে নারে
দুয়ারে দাঁড়িয়ে পুজো
নীল আকাশের মেঘের ভেলায় গণেশজননী খুঁজো

কুমোর পাড়ায় গড়ছে ঠাকুর সিংহ ভীষণ রেগে
অসুরব্যাটাকে কামড়ে ধরেছে বীর বিক্রম বেগে
তাকুড় নাকুড় তাক
শিউলি সুবাস গায়ে মেখে নিয়ে বাজলো পুজোর ঢাক।



দাদু নাতি | লায়লা আরজুমান সুইটি


খোকন সোনা রাগ করেছে
আর খাবেনা ভাত!
আদর কদর যতোই করো
বুঝাও না পাঁচ সাত।
পড়তে আমার ভাল্লাগেনা
খেলা দোলা খায়,
নীল আকাশে ঘুড়ি হয়ে
উড়তে মনে চায়।
সাতরঙা ঐ রামধনুটা
আমার কেনো নয়?
দাদু কেবল পড়তে বলে
দুইয়ে চারে ছয়।
সাদা মেঘের ভেলায় ভেসে কল্পে চাঁদে যাই
অলি হয়ে ফুলের বাগে
কতোই মধু খাই।
পড়ালেখায় হেলাফেলায়
ধরেছে দাদু কান!
তাই তো খোকা ভাত খাবে না
খুব করেছে মান।
রাগ করে না নাতি সোনা
আমার দিকে চাও,
মেলায় নিয়ে যাবো তোমায়
একটু হাসি দাও।

ব্যাঙের বিয়ে | আবুল খায়ের



বাঘাডোবা ব্যাঙের বাড়ি
ভাঙ্গবে হাড়ি,
রানুদিদি, দাদার সনে
ধর'ছে আড়ি।
বৃষ্টি হলেই কোলা ব্যাঙের লম্বা সারি,
জোর'সে ডাকে ভাসিয়ে
জলে দাড়ি।
ডোবার জলে নাতি
ব্যাঙের বিয়ে,
মুষলধারে বৃষ্টি এলে
সঙ্গে যাবে টিয়ে।
সানাই বাজবে,বাজবে
আরও ঢোল,
নাচ হবে গান হবে
পড়বে গালে টোল।

শিক্ষকের মর্যাদা | মুহাম্মদ বরকত আলী

 

কবিতা থেকে গল্পঃ


দিল্লীর এক প্রভাবশালী বাদশার কথা শোনাব আজ। বাদশার উত্তরাধীকারি হিসেবে একমাত্র শাহাজাদা ছিল। শাহাজাদারা রাজ্য পরিচালনার জন্য যুদ্ধবিদ্যাসহ অন্যান্য শাস্ত্রেও শিক্ষা নেয়। কিন্তু যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা নেওয়ার জন্য উপযুক্ত বয়স আর শারীরিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে। শাহাজাদাকে আদব কায়দা শেখানোর জন্য খুব অল্প বয়সে, মানে তোমাদের এখন যত বয়স, ঠিক সেই বয়সে দিল্লীর একটা মক্তবে মৌলভীর কাছে পাঠানো হল। দিন যায়, মাস যায় শাহাজাদা মক্তবের মৌলভীর কাছে আদব কায়দা শিখতে থাকে। বাদশা সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের চোখে দেখে আসবে শাহাজাদা ঠিকঠাক শিক্ষা নিচ্ছে কিনা। যেই বলা সেই কাজ। পরের দিন সকালবেলা বাদশা ছদ্মবেশে হাজির হলেন মক্তবে।

মক্তবে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলেন, মৌলভী বসে বসে অজু করছে, শাহাজাদা তার মৌলভীর পায়ে পানি ঢালছেন। মৌলভী নিজ হাতে পায়ের আঙ্গুল পরিস্কার করছেন। এতক্ষণ পর মৌলভী দেখতে পেলেন বাদশা স্বয়ং এসেছেন মক্তবে। মৌলভী উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করতেই, বাদশা কথা না বলেই প্রবেশ দ¦ার থেকেই ফিরে গেলেন রাজদরবারে। মৌলভী সাহেব বিচলিত হয়ে পড়লেন। কি জানি কি হয়!
পরের দিন সকালে রাজ দরবারে ডাক পড়লো মৌলভী সাহেবের। মৌলভী সাহেব ভয়ে কিছুটা দুমড়ে গেলেন। দিল্লীর অধিপতি বাদশা আলমগীরের একমাত্র শাহাজাদাকে পাঠিয়েছেন শিক্ষা লাভের জন্য, আর আমি তাকে দিয়ে অযুর পানি আনিয়েছি। শুধু কি তাই! শাহাজাদাকে দিয়ে আমার পায়ে পানি ঢেলে নিয়েছি। হয়তো আজ আমার গর্দান যাবে।
কিছুক্ষণ পর আবার বুক ফুলিয়ে মৃদু হেসে মনে মনে বললেন, শিক্ষক আমি, দিল্লীর অধিপতি বাদশা সে কোথাকার। যায় যাবে গর্দান, তবুও আমি চাইবো না প্রাণ ভিক্ষা।

রাজ দরবারে বাদশা সিংহাসনে বসে আছেন। মন্ত্রিবর্গ, অন্যান্য সভাসদেরাও নিজ নিজ আসনে বসে আছেন।
মৌলভী সাহেব দরবারে হাজির হলেন। সকলেই চুপচাপ। বাদশা বললেন, মৌলভী সাহেব, আপনি আমার ছেলেকে একটুও আদব কায়দা শেখাননি? সেতো শিখেছে বেয়াদবি।

গতকাল শাহাজাদা আপনার পায়ে অযুর পানি ঢালছে, আর আপনি নিজ হাতে আপনার পায়ের আঙ্গুল পরিস্কার করছেন, এটা কি বেয়াদবি না? আমি খুব খুশি হতাম যাদি দেখতাম যে, শাহাজাদা আপনার পায়ে পানি ঢালছে আর তার নিজ হাত দিয়ে আপনার পা ধুয়ে দিচ্ছে।এ কথা শুনে সভাসদ সকলেই বাদশার জয় ধ্বনি দিতে লাগলেন। মৌলভী সাহেব বুক ফুলিয়ে বাদশাকে কুর্নিশ করলেন আর বললেন, সত্যিই আপনি মহান উদার বাদশা আলমগীর। সেই থেকে শিক্ষকের মর্যাদা আরও বেড়ে গেল। সকলেই শিক্ষকদের সম্মান করে। তোমরাও শিক্ষকদের কথা মত চলবে আর তাদেরকে শ্রদ্ধা করবে।

( কাজী কাদের নেওয়াজ‘র ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতা অবলম্বনে।)
মেহেরপুর, সদর

কবি সিদ্দিক আবু বকর এর একগুচ্ছ ছড়া



 ক. সৈকতে আমি

খালি গায়
খালি পায়,
সৈকতে আমি-
ভোঁদৌড় দৌড়াই
রদ্দুরে ঘামি।
এই যা টলে পা
ধপ্পাস, থামি।
গা জ্বলা দুপুরে
সাগরে নামি।
হাপ্পুস হুপ্পুস
ঢেউটা দামী
সৈকতে দৌড়াই
সাগরে নামি।

খ. চিনুক সবাই


শামুক, ঝিনুক
           চিনুক
           চিনুক
সবাই চিনুক।
সবাই কিনুক
ঝিনুক মালা
শামুক বালা
কানের দুল
সাগর ফুল।

রূপের খামার
কিনুক সবাই
সৈকত আমার
চিনুক সবাই।

গ. গর্জন

হুম হুম
গুম গুম,
সোঁ সোঁ সাঁ!
তেড়ে ফুঁড়ে
আসে অই
সাগরের জাঁ
সোঁ সোঁ 
সোঁ সোঁ
সাঁ সাঁ সাঁ।
উঁচু ঢেউ গর্জন
তীরে থেমে যা
ভিজে যাক
খুকু মনি
বাঁধনের পা।


দুঃস্বপ্নের ঘোর | খন্দকার নূর হোসাইন


 

উদ্দেশ্যহীনভাবে শহরের রাস্তায় হাঁটছি, আমি আর আমার বন্ধু। এই ভরদুপুরে কেন যেন রাস্তাটা নিরব নির্জন হয়ে আছে। কিন্তু কেন তা আমি জানিনা। জানার জন্য কোনো মাথা ব্যাথাও নেই আমার। হঠাৎ রাস্তার দুইপাশ থেকে কিছু ছেলে মেয়ে রাস্তায় নেমে এল। ঘিরে ধরলো আমাদের। তাদের হাতে একটা ব্যানার। কিসের ব্যানার তা আমি জানিনা৷ তাদের সাথে কোনো মিছিল বা শোভাযাত্রায় অংশ নিতে হবে। কিসের মিছিল তা জানার কোনো আগ্রহই নেই আমার। যেমন ভাবে ওরা এসেছিলো ঠিক তেমনিভাবে মিছিল শেষ হয়ে গেল। পথের মধ্যে উদয় হলো একটা পুলিশ ভ্যান। হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম, আমি একা দাড়িয়ে নির্জন একটা রাস্তায়। আমার সাথের বন্ধুটি নেই৷ কোথায় সে? আর সেই ছেলে মেয়েগুলো কোথায় হারিয়ে গেল এত তাড়াতাড়ি? এই প্রশ্নও আমাকে চিন্তিত করলোনা৷ সামনে থাকা পুলিশের গাড়িটার দিকে মনোযোগ দিলাম। পর পর পার হয়ে গেল দুটো গাড়ি। কিন্তু কি অদ্ভুত গাড়ি এগুলো । এমন গাড়ি আমি জীবনেও দেখিনি। ট্রাক আর বাসের আকৃতি মিলিয়ে বেশ উঁচু সাইজের অদ্ভুত এক গাড়ি। দেখলে কেন যেন গায়ে কাঁটা দেয়৷ গাড়ি দুটোর দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মনে হল আমার বাড়ি ফেরা দরকার। কিন্তু একি? আমি একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত ডাবল লেনের রাস্তায় দাড়িয়ে আছি। এর দুই পাশে কালো রঙের বহু পুরনো সব দালান৷ এই রাস্তা থেকে বের হতে চাইলাম আমি। অথচ, রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে রাখা একটা ট্রাক। এই ট্রাক আবার কোথা থেকে আসলো? কোনোকিছু চিনতে পারছিনা এখানকার। অচেনা অজানা কোনো শহরে চলে এসেছি আমি। রাস্তার দুইপাশে বাড়ি, তাই রাস্তা দিয়ে সোজা যাওয়া ছাড়া এ রাস্তা থেকে মুক্তি মিলবেনা৷ কিন্তু ট্রাকটা তো রাস্তার মাঝখানেই দাড়িয়ে আছে এখনো। ট্রাকের নিচ দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ওপারে তিন রাস্তার মোড়৷ ট্রাক ও একটা বাড়ির দেয়ালের মাঝখানে হালকা একটু ফাঁকা স্পেস। স্পেস দিয়ে দক্ষিণের রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে। একটা অস্পষ্ট অবয়বের লোককে দেখলাম ওদিকের রাস্তায়। আমার চোখের দৃষ্টি শক্তি কমে গেলো নাকি এখানকার মানুষগুলো এমন তা বুঝতে পারলাম না৷ দ্রুত রাস্তার সাথের একটা বাড়ির গেটের কাছে লুকিয়ে পড়লাম৷ আশা করছি লোকটা আমাকে দেখেননি। এখানকার সবকিছুই অদ্ভুত, তাই কাউকে বিশ্বাস করতে চাইনা আমি৷ যেভাবেই হোক পালাতে হবে এ শহর থেকে। এখনো সেই ট্রাকটা রাস্তায় দাড়িয়ে আছে। উপায় না দেখে রাস্তায় শুয়ে পড়লাম। বুকের উপর ভর দিয়ে গেরিলাদের মতো ট্রাকের নিচে চলে এলাম। হঠাৎ আমার বুকের খাঁচায় বাড়ি পড়লো। শহরটা অন্ধকার হতে শুরু করেছে। আশ্চর্য, একটু আগেও তো দিনের আলো ছিল। তবে কি ওটা শেষ বিকেলের আলো ছিল? না এমনটা হতেই পারেনা। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, দুপুরের টানা রোদ ছিল একটু আগে ৷ কয়েক মিনিটে কিভাবে অন্ধকার হবে? প্রশ্নগুলো নিজেকেই করলাম৷ আমি যে ট্রাকের নিচে শুয়ে আছি, তার দরজা খটাস শব্দে খুলে গেল৷ নেমে এল কালো বুট পরা এক জোড়া পা। লোকটা ট্রাকের আশেপাশে কিছু খুঁজতে  লাগল। সংকিত হয়ে উঠলাম, আমাকে খুঁজছে না তো? মনে হলো এই বুঝি ট্রাকের নিচে উঁকি দিল লোকটা। বুকের কাঁপুনি তখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে আমার৷ কিন্তু না, লোকটা ট্রাকের নিচে উঁকি দিলোনা, চলে যেতে লাগল পশ্চিমের রাস্তার দিকে , আমি শুধু তার কালো জোতা জোড়া ও কালো প্যান্টটা দেখতে পেলাম। লোকটা চলে যাওয়ায় স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেললাম। দক্ষিণের রাস্তায় প্রথম দেখা সেই লোকটা এখনো আছে। না সেদিকে যাবনা আমি। দ্রুত ট্রাকের নিচে থেকে বেরিয়ে দৌড় দিলাম। কিছু দূর দৌড়ে আসার পর যখন বুঝলাম কেউ আমার পিছু নেয়নি, তখন দাড়িয়ে পড়লাম। দুই হাঁটুর উপর শরীরের ভর দিয়ে  হাফাতে লাগলাম। এবার খেয়াল করলাম, আমি আরো কোনো চিপা গলিতে ঢুকে পড়েছি। এই রাস্তার দুই পাশে স্কুলের মতো লম্বা ঘর। এগুলোও কালো রঙের ৷ আশেপাশে ময়লা আর্বজনা পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিন কোনো মানুষ এদিকে আসেনি৷ মনে হচ্ছে কোনো করিডোরে চলে এসেছি। আরো অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশটা। ততক্ষণে  ভয়ঙ্কর সব শব্দ আমার কানে আসতে লাগল। আমি খুব একা এখানে, অজানা কোনো ভূতুড়ে শহরে চলে এসেছি আমি । কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে এটা কিভাবে হলো তা আমি এখনো বুঝতে পারছিনা। এ কেমন সময়ের জালে ফেঁসে গেলাম আমি? আমার বন্ধুটি কোথায় গেল, আমাকে ছেড়ে? এই দুঃসহনীয় পরিবেশে আমি একা। আমি এখানে আর এক মুহূর্তও থাকতে চাইনা। তাকিয়ে দেখি সামনে আর কোনো  রাস্তা নেই। কোথায় যাবো আমি? আমি এটাকে দুঃস্বপ্ন ভাবতে চাইলাম। মুক্তি  পেতে চাইলাম এই স্বপ্ন  থেকে। জোরে একটা চিৎকার দিলাম। ঠিক তখনি নিজেকে চিরচেনা  বেডে আবিষ্কার করলাম। কিন্তু এখানেও বিপদ কমলোনা। আমি দেখলাম আমার বেডে কম্বলের উপর ফুট  তিনেক লম্বা, সাদা রঙের  উপর কালো ফোঁটা  দেয়া একটা সাপ শুয়ে আছে। আমার দিকেই তাকিয়ে  আছে ওটা। আমি নড়তে পারছিনা। শরীরের পেশিগুলো যেন অবশ হয়ে গেছে। তবে কি সাপটা আমাকে কামড় দিয়েছে? আরো ভয় পেয় গেলাম আমি। শরীরের  সমস্ত শক্তি  দিয়ে উঠার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, এবার উঠে বসলাম আমি। তারপর খাট থেকে নেমে সোজা দরজার দিকে দৌড় দিলাম । পরে এসে দেখি বিছানায় কোনো সাপ নেই। মজার ব্যাপার হলো, যখন আমার ঘুম ভেঙেছে ঠিক তখনি দৌড় দিতে পেরেছি। তবে কি এর আগে স্বপ্নেও ঘুম ভেঙে ছিলো? দুঃস্বপ্ন  থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর  শুকরিয়া আদায় করলাম। (সমাপ্ত)