বিজ্ঞাপন

৬ষ্ট বর্ষে শিশুকিশোর টুনটুনি! টুনটুনির সকল লেখক, পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা!

বৃক্ষরোপন আনুষ্ঠানিক কর্মসূচী নয়, এটি অস্তিত্বের লড়াই । মাহমুদুল হক আনসারী

 



পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে গাছ লাগানোর বিকল্প নেই। আমাদের চার পাশ গাছ পালা শূন্য হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির চার পাশে থাকা অনেক প্রাকৃতিক পরিবেশ কে আমরা ধ্বংস করে ফেলছি। পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে। খাল সমুহের  চার দিক দখল হচ্ছে।  পাহাড়ের গাছপালা উঝাড় করে ফেলছে। সারা দেশের বন বিভাগের সামনে এই সব বিলুপ্ত হচ্ছে।  পরিবেশ অধিদপ্তর আছে, কিন্তু  পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে না। প্রাকৃতিক যেই পরিবেশটি আল্লাহ  আমাদের জন্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন  সেই পরিবেশটিক্ওে বাঁচিয়ে রাখছি না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খালি জায়গায়  গাছ লাগাই।  ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের খালি স্থানে বৃক্ষ রোপন করা যায়। ফল, শাক সব্জির ছোটো খাটো বাগান তৈরি করা যায়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা  ইমাম, মুয়াজ্জিন,  মসজিদ কমিটির তত্ত্বাবধানে এই বাগান ও ফল ফলাদি  পরিচর্যার ব্যাবস্থা নেয়া খুব সহজ বিষয়।  মসজিদের মুসল্লি, কমিটি, সন্মিলিত ভাবে বৃক্ষের নিয়মিত দেখবাল করতে পারে।  ফলে মসজিদের পরিবেশ সুন্দর হবে।  অর্থনৈতিক সফলতা ও আসবে। পুষ্টির চাহিদা মিটাতে পারবে। 

সরকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে নানা দপ্তর সৃষ্টি করেছে।  তারা এইসব দেখার কথা। কিন্তু  তারা যে ভাবে এই সব বিষয় দেখার কথা ছিল  সেই ভাবে দেশবাসি সেবাটি পাচ্ছে না।  তাদের কাছে কোনো নাগরিক  অভিযোগ করলে তাদের দৌড়া দৌড়ি দেখা যায়। আর ততদিনে সেই বাগান পাহাড় বন শেষ করে ফেলে ।  যাবো, যাচ্ছি,  করবো করছি  এইসব শুনতে হয় অভিযোগ কারিদের। 

ন্যাড়া পাহাড় গুলোকে গাছ লাগিয়ে  আবার সতেজ করা হউক। সারা দেশের বনজ সম্পদ রক্ষা করা হউক। চট্টগ্রামে সিতাকুন্ড, আকবরশাহ, বায়েজিদ , হাটহাজারি এলাকার পাহাড়  এখন চোঁখেপড়েনা।  এখানে সব দালান আর বাড়িঘর। হাজারে  হাজার মানুষের বসতি স্থাপন করেছে।  সেখানে সিন্ডিকেট।  তাদের সাথে উপরে নিচে সকল স্তরের কর্মকর্তাদের সথে নাকি সম্পর্ক এমন কথা জনগন শুনে আসছে। ফলে নির্ভিগ্নে সেখানে  ইচ্ছে মতো পাহাড় ও পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে।  সংবাদ মাধ্যমে চট্টগ্রামের এই সব পাহাড়  নিয়ে বহু বার প্রতিবেদন হয়েছে।  কয়েক দিন প্রশাসন  নড়ে চড়ে বসলেও আবার সেই  পুরোনো অবস্থা দেখা যায়। চট্টগ্রামে  প্রতি মাসে শত শত পাকা দালান তৈরি হচ্ছে। জমির অবস্থান কমছে। ফসলের উৎপাদন  হ্রাস পাচ্ছে।  কল কারখানা বাড়ছে।  মিলের ধোঁয়া বাতাসে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। সেই তুলনায় প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার উদ্দোগ নেই বলা চলে। কোনো ভাবেই খালি জমি রাখা যাবেনা। যার যার অবস্থান থেকে গাছ লাগাই। সন্মিলিত ভাবে বৃক্ষের সংরক্ষণ ও চর্চা করি। কোনো জনপ্রতিনিধি যেনো বৃক্ষ নিধন করতে না পারে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর কে  নজর রাখতে হবে।

মানব সমাজের রক্ষার জন্য  আমাদের চার পাশের পরিবেশ রক্ষার বিকল্প নেই। গাছ কাটা, পুকুর নদী ভরাট করতে দেয়া যাবেনা। চট্টগ্রামের কর্নফুলী নদীর আশ পাশসহ সরকারি নদী পাহাড় উদ্ধার করতে হবে। এইসব নদী পাহাড়ের অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে। নগরবাসির বাসাবাড়ির  উচ্ছিষ্ট নদীতে ফেলা নিয়š্রÍন করতে হবে। এই সব নদী খাল ভরাট করে গড়ে উঠা  দোকান, ঘর,মার্কেট উচ্ছেদ করতে হবে।  এই সব সরকারি জমিতে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠা  এলাকায় বিদ্যুৎ  পানির লাইন কিভাবে পায়, সেখানেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

যার যার অবস্থান থেকে গাছ লাগাই। ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খালি জায়গা গাছ লাগিয়ে  পরিবেশ বাঁচাই নিজে বাঁচি। স্কুল মাদ্রাসা সকল শিক্ষাপ্রতিষ্টানে গাছ লাগানোর ও পরিবেশ রক্ষার উপর গুরুত্ব বহন করে প্রেকটিকেল ভাবে ছাত্রদের  মানসিক ভাবে শিক্ষা প্রদান করি। প্রধানমন্ত্রির ২৫ কোটি চারা রোপণের অভিজান সফল ও বাস্তবায়ন হোক।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এই বাংলাদেশ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাস্তবায়নের জন্য যে কয়টি উদ্যোগ হাতে নিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো-পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ। ভৌগোলিক অবস্থান, অতি-ঘনবসতি এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। প্রতিবছর তীব্র তাপপ্রবাহ, ঋতুচক্রের পরিবর্তন ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত আমাদের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। এই সংকট মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার বৈজ্ঞানিক উপায় হিসেবে চিহ্নিত। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে অতীতের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক, পরিবেশ-উপযোগী ও টেকসই পদ্ধতি অনুসরণ করা সময়ের দাবি।

দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক। সরকারি খতিয়ান অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বলা হলেও পরিবেশবিদ ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক সংস্থাসমূহের মতে, প্রকৃত ‘ক্যানোপি কাভার’ বা ঘন বনাঞ্চলের পরিমাণ ১০ থেকে ১২ শতাংশের বেশি নয়। বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের দায় মাত্র শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ হলেও বিগত দুই দশকে দেশে গড় তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। সাম্প্রতিক তীব্র তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের লাল তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩১ প্রজাতির বন্য প্রাণী এবং কয়েক ডজন দেশীয় উদ্ভিদ প্রজাতি গত এক শতাব্দীতে চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে এবং হচ্ছে।


অতীতের অভিজ্ঞতা: দেশীয় ও বৈশ্বিক শিক্ষা

আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থায়নে সামাজিক বনায়নের নামে দ্রুত বর্ধনশীল বিদেশি প্রজাতি যেমন-ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি ও রেইনট্রি ব্যাপকভাবে রোপণ করা হয়। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে প্রমাণিত, তৎকালীন প্রেক্ষাপটে এর তাৎক্ষণিক সুফল ব্যাপক হলেও, দীর্ঘ মেয়াদে এই বনায়ন বিপুল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির সংকট (দেশের বরেন্দ্র অঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নামিয়ে দিয়েছে) এবং পাখি ও বন্য প্রাণীর খাদ্যসংকট (স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করেছে) এর মধ্যে অন্যতম।

ইতিহাস বলে, ২০১৯ সালে তুরস্ক এক দিনে ১ কোটি ১০ লাখ চারা রোপণ করে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বৈজ্ঞানিক মাটি পরীক্ষা না করে শুষ্ক মৌসুমে রোপণের কারণে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ৯০ শতাংশ চারাই পানির অভাবে মারা যায়।

সাহারা মরুভূমির সম্প্রসারণ রোধে আফ্রিকার ১১টি দেশ মিলে ৮ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ বনাঞ্চল তৈরির মেগা প্রকল্প হাতে নেয়। প্রথম দিকে শুধু গাছ লাগানোর ওপর জোর দেওয়ায় চারা বেঁচে থাকার হার কম ছিল। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় আদিবাসী ও সুনির্দিষ্ট ‘বাস্তুতান্ত্রিক জোন’ অনুযায়ী প্রজাতি নির্বাচন করায় প্রকল্পটি এখন সফলতার মুখ দেখছে।


দেশে প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণ ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে বৃক্ষ রোপণ একটি প্রধান নিয়ামক হলেও বিপর্যয় ঠেকাতে যথেষ্ট নয়। প্রধানমন্ত্রীর ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগকে সফল করতে প্রথাগত কৃত্রিম চারা রোপণ কর্মসূচির পাশাপাশি একটি যুগান্তকারী ও পরিবেশবিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি যুক্ত করা প্রয়োজন। পরিবেশবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অ্যাসিস্টেড ন্যাচারাল রিজেনারেশন (এএনআর) বা ‘সহায়ক প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন’।


কৃত্রিমভাবে নার্সারিতে চারা তৈরি করে, তা পরিবহন করে মাটিতে রোপণ করার প্রক্রিয়ায় বিপুল ব্যয় ও শ্রমের প্রয়োজন হয়, অথচ প্রতিকূল আবহাওয়ায় সেই চারার বেঁচে থাকার হার অনেক সময় আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এর বিকল্প বা সহযোগী হিসেবে এএনআর পদ্ধতি কোনো কৃত্রিম রোপণ ছাড়াই প্রকৃতির নিজস্ব পুনরুৎপাদন ক্ষমতাকে কাজে লাগায়। মাটিতে সুপ্ত থাকা কোটি কোটি বীজ, গাছের গোড়া এবং বুনো চারাগাছকে মানুষের তৈরি নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত করে প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ বন গড়ে তোলাই এই পদ্ধতির লক্ষ্য।

বাস্তুবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী, কৃত্রিম বনের চেয়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বন অনেক বেশি টেকসই ও শক্তিশালী। এর বৈজ্ঞানিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

দৃঢ় মূলতন্ত্র: প্রধান মূল মাটির গভীরতম স্তরে প্রবেশ করে তীব্র ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও খরার বিরুদ্ধে বহুগুণ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।


অনন্য জীববৈচিত্র্য: স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগী শত শত প্রজাতির দেশীয় উদ্ভিদ, লতাগুল্ম, পরজীবী ও ছত্রাক একযোগে বৃদ্ধি পায়, যা বন্য প্রাণীর আদর্শ আবাসস্থল তৈরি করে।

পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে স্থলজ বনায়ন যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের জলবায়ু সুরক্ষায় নদী, হাওর, বিল ও উপকূলীয় জলাভূমির জলজ উদ্ভিদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবিজ্ঞানের ভাষায় জলাভূমির এই উদ্ভিদভিত্তিক বনায়নকে ব্লু-কার্বন নেটওয়ার্ক বলা হয়। মিঠাপানির জলাভূমিগুলোতে হিজল, করচ, বরুণ, পিঠালি ও ঢোলকলমির মতো জলসহিষ্ণু উদ্ভিদ প্রজাতি প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্ষায় মাসের পর মাস পানির নিচে ডুবে থেকেও এগুলো বেঁচে থাকে। এই গাছগুলো হাওরাঞ্চলের তীব্র ঢেউ থেকে গ্রামীণ জনপদকে রক্ষা করে এবং মাটির ক্ষয়রোধ করে। শাপলা, পদ্ম, কলমি এবং বিভিন্ন দেশীয় ভাসমান ও নিমজ্জিত জলজ উদ্ভিদ পানির পুষ্টি উপাদান নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলো পানির অতিরিক্ত কার্বন ও ভারী ধাতু শোষণ করে প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। সুন্দরবন ও উপকূলের চরাঞ্চলের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ-কেওড়া, বাইন, গেওয়া, গোলপাতা স্থলভাগের উদ্ভিদের চেয়ে প্রায় ৪ থেকে ১০ গুণ বেশি কার্বন মাটির নিচে জমা রাখতে পারে। এই জলজ-উপকূলীয় বনাঞ্চল প্রাকৃতিকভাবে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্র সাইক্লোন প্রতিরোধী প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।

বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়। প্রাণী ছাড়া উদ্ভিদের এবং উদ্ভিদ ছাড়া প্রাণীর বংশবৃদ্ধি অসম্ভব। বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ সপুষ্পক উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধির জন্য কীটপতঙ্গের প্রয়োজন হয়। বুনো মৌমাছি, প্রজাপতি, ভোমরা এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছি না থাকলে বনের ফলদ ও বনজ গাছের পরাগায়ন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে। কীটপতঙ্গের এই বৈচিত্র্য ধ্বংস হলে বন প্রাকৃতিকভাবে নতুন চারা গজানোর ক্ষমতা হারায়। বনের বড় বড় দেশীয় গাছ, যেমন বট, গর্জন, চাপালিশ, আমলকী ও বহেড়ার বীজ ছড়ানোর মূল কারিগর হলো বনের প্রাণীকুল। ফলখেকো পাখি (যেমন ধনেশ, হরিয়াল) ও বাদুড় ফল খেয়ে দূরদূরান্তে মলত্যাগের মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে দেয়। বাদুড়ের পাকস্থলীতে বীজের যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, তা বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বানর, হনুমান, মেছোবিড়াল, হরিণ ও বন্য শূকর বনের ফল খেয়ে বীজ মাটিতে ফেলে দেয় বা মলমূত্রের মাধ্যমে মাটিতে মেশায়। হাতির মতো বড় প্রাণী বনের গহিন অঞ্চলে মাইলের পর মাইল হেঁটে বীজ বিস্তারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশের বনগুলো থেকে শিয়াল, উদবিড়াল, শকুন, বনরুই এবং নানা প্রজাতির বুনো বিড়াল হারিয়ে যাচ্ছে। মৃত পশুর মাংস খেয়ে শকুন বনকে অ্যানথ্রাক্স বা রেবিসের মতো মারাত্মক মহামারি থেকে রক্ষা করে। বনের মাটিকে আলগা করা এবং ঝরা পাতাকে জৈব সারে (হিউমাস) রূপান্তরের কাজটি করে কেঁচো ও উইপোকা। এগুলো মাটির নাইট্রোজেন চক্র সচল রাখে, যা এএনআর পদ্ধতিতে নতুন চারা গজানোর প্রধান শর্ত।

বনের বাস্তুতন্ত্র কতটা সুস্থ, তা নির্ভর করে তার খাদ্যশৃঙ্খলের পূর্ণতার ওপর। গত এক শতাব্দীতে চিরতরে হারিয়ে গেছে ডোরাকাটা বাঘের প্রধান চারণভূমি (যেমন মধুপুর বা চিলমারী অঞ্চল), ক্যাস্পিয়ান বাঘ, জাভান গন্ডার, এশীয় মহিষ, ভারতীয় গন্ডার প্রভৃতি। বনে যখন তৃণভোজী বড় প্রাণী (যেমন বনগরু বা হরিণ) এবং শীর্ষ শিকারি (যেমন বাঘ বা চিতাবাঘ) থাকে না, তখন বনের উদ্ভিদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। বনগরু বা হরিণের মতো তৃণভোজী প্রাণীরা বনের অতিরিক্ত ঘাস ও লতাগুল্ম খেয়ে ছোট চারাগাছগুলোর জন্য সূর্যের আলো পাওয়ার পথ সুগম করে। আবার এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাঘ বা চিতাবাঘের মতো শীর্ষ শিকারির উপস্থিতি অপরিহার্য। প্রাকৃতিক বনায়ন মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের উপযুক্ত বনে (যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সিলেটে) গয়াল, সাম্বার হরিণ এবং মায়া হরিণের মতো বিলুপ্তপ্রায় তৃণভোজী প্রাণী আবারও অবমুক্ত করা যায়। একই সঙ্গে সুন্দরবনের বাইরে দেশের অন্যান্য মিশ্র চিরহরিৎ বনে ছোট চিতাবাঘ এবং লার্জার ক্যাটের সুরক্ষায় বিশেষ জোন তৈরি করতে হবে। খাদ্যশৃঙ্খল পূর্ণতা পেলে বনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে একটি স্বয়ংক্রিয় বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য তৈরি হবে, যা বনের প্রাকৃতিক বৃদ্ধিকে স্থায়ী রূপ দেবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশাল অর্থ ব্যয় করে কৃত্রিম বনায়ন করার চেয়ে এএনআর পদ্ধতি ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণকে একীভূত করে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। এ ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের ডানাউ মডেল, নাইজারের কৃষক-পরিচালিত প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন, কোস্টারিকার চারণভূমি পুনরুদ্ধার ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা যায়।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বনের কার্বন ধারণ ক্ষমতাকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করা সম্ভব। যেমন কার্বন ট্রেডিং বা কার্বন ক্রেডিট (বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী, উন্নত বিশ্বের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের নিঃসৃত কার্বনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে উন্নয়নশীল দেশের বনাঞ্চলকে অর্থ দেয়) ও গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নকে (জাতিসংঘের জলবায়ু তহবিল এবং বিশ্বব্যাংক বর্তমানে কৃত্রিম বনায়নের চেয়ে প্রাকৃতিক সমাধান-এনবিএস) বেশি অর্থায়ন করছে। 

আসুন, পরিবেশের  জন্য ক্ষতিকর মানুষ ও সিন্ডিকেট  চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসি। পরিবেশ বাঁচান, দেশ বাঁচান, সমাজ রক্ষা করুণ। সব ধরনের রাজনীতির  প্রেসার মুক্ত এই আইনের  বাস্তবায়ন থাকা চাই। জীবন সঙ্গী হিসেবে গাছ ও বাগানকে ভালো বাসতে শিখি। সকলে নিজ নিজ অবস্থান থেকে গাছ লাগাই পরিবেশ রক্ষা করি।

লেখক

মাহমুুদুল হক আনসারী

সংগঠক,গবেষক,কলামিষ্ট ও 

চেয়ারম্যান: নিরাপদ বিশ্ব ফোরাম


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন